দেশের জন্য জীবন বাজি রাখতে ‘জানফাদা’, যুক্ত তিন কোটি ইরানি, আছেন তরুণীরাও

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: October 26, 2026

‘জানফাদা’ কর্মসূচিতে তরুণদের অংশগ্রহণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে সব বয়সী মানুষই এতে যোগ দিতে পারেন। তাঁদের অস্ত্র ও অন্যান্য সরঞ্জাম দিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এর উদ্দেশ্য সরকারের ‘বিপ্লবী’ মূল্যবোধ রক্ষা করা।.যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের আবারও যেকোনো সময় যুদ্ধ শুরু হতে পারে বলে আশঙ্কা বাড়ছে। যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত রাতে বলেছেন, শিগগিরই হামলা চালাচ্ছেন না। আর আগের দিন বলেছিলেন, রোববারের (গতকাল) মধ্যে হামলা চালাবেন নয়তো ইরানের সঙ্গে চুক্তি হবে। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষকে অস্ত্র দেওয়া ও সামরিক প্রশিক্ষণের একটি কর্মসূচিতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে ইরান সরকার। এ কর্মসূচির আওতায় প্রশিক্ষণ পাওয়া ব্যক্তিরা দেশের নিরাপত্তার জন্য কাজ করবেন জীবন বাজি রেখে। অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি হুমকি মোকাবিলায় তাঁদের কাজে লাগানো হবে। এই গণসংগঠিতকরণ কর্মসূচির নাম দেওয়া হয়েছে ‘জানফাদা’। এর অর্থ ‘যাঁরা জীবন উৎসর্গ করেন’। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধের মধ্যে গত মার্চের শেষ দিকে এই কর্মসূচি চালু করা হয়। এখন ইরানের বড় অংশে এই কর্মসূচি ছড়িয়ে পড়েছে। এর মাধ্যমে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে নারী ও পুরুষদের যুক্ত করার চেষ্টা চলছে। তরুণদের অংশগ্রহণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে সব বয়সী মানুষই এতে যোগ দিতে পারেন।.ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) অধীন বাসিজ মিলিশিয়া এবং সরকারের অন্যান্য সংস্থার প্রতিনিধিরা বিভিন্ন সড়কে অসংখ্য বুথ ও কেন্দ্র স্থাপন করেছেন। সেখানে সাধারণ মানুষকে অস্ত্র ও অন্যান্য সরঞ্জাম ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এর উদ্দেশ্য সরকার ও তার ‘বিপ্লবী’ মূল্যবোধ রক্ষা করা।এই কর্মসূচির আওতায় তেহরান, ইসফাহান, জানজান, শিরাজ, কেরমান, মাশহাদ, বোজনুর্দ, আহভাজসহ বিভিন্ন শহরে সরকারি উদ্যোগে অনুষ্ঠান ও সশস্ত্র ‘মহড়া’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ইরানের ৩১টি প্রদেশের অনেক বড় ও ছোট শহরেও এ ধরনের আয়োজন করা হয়েছে।.তেহরানের অন্তত ১৪টি প্রধান চত্বরকে জানফাদা স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম সরবরাহের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করতে চায় আইআরজিসি।আলী কাউসারি, বাসিজের প্রশিক্ষণবিষয়ক উপপ্রধান .চলতি মাসে এক সংবাদ সম্মেলনে বাসিজের প্রশিক্ষণবিষয়ক উপপ্রধান আলী কাউসারি বলেন, তেহরানের অন্তত ১৪টি প্রধান চত্বরকে জানফাদা স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম সরবরাহের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করতে চায় আইআরজিসি। তিনি বলেন, প্রতিটি প্রদেশের রাজধানীতে অন্তত এক থেকে তিনটি চত্বর ব্যবহারের লক্ষ্য রয়েছে। তবে বর্তমানে কতটি শহরে এই কর্মসূচি চলছে, তা তিনি জানাননি।সরকারি উদ্যোগে রাতেও বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে। কখনো কখনো দিনের বেলায় সমাবেশ ও গাড়িবহর নিয়ে শোভাযাত্রাও অনুষ্ঠিত হয়। ইরানের উত্তরাঞ্চলীয় গিলান প্রদেশের এক বাসিন্দা আল-জাজিরাকে বলেন, প্রদেশটির বড় ও ছোট শহরগুলোর সড়কে নিয়মিত সরকারি কেন্দ্র দেখা যাচ্ছে। যাতায়াতের পথে সাধারণ মানুষ এসব কেন্দ্র দেখতে পান।.ইসরায়েলের নির্বাচনে ‘কিংমেকার’ কে এই আব্বাস, নেতানিয়াহুকেও সরিয়েছিলেন তিনি.নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই বাসিন্দা বলেন, ‘মাঝেমধ্যে তারা ছোটখাটো পুরস্কার দেওয়ার জন্য প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। তারা তাজা গুলি নিয়ে আসে। কীভাবে ম্যাগাজিনে গুলি ভরতে হয়, কীভাবে পিস্তল ও রাইফেল ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত করতে হয় এবং কীভাবে নিশানা করে গুলি চালাতে হয়, তা শেখায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘আয়োজকদের বেশির ভাগই বয়স্ক পুরুষ। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রায় প্রতি রাতেই তাঁরা প্রধান চত্বরে জড়ো হচ্ছেন। সেখানে প্রায়ই বিপ্লবী গান বাজানো হয়। লাউডস্পিকারে স্লোগানও দেওয়া হয়।’.১৫ অক্টোবর গিলান প্রদেশের রাশত শহরে রাতে সরকারপন্থী একটি সমাবেশের আয়োজন করা হয়। এ সময় উচ্চশব্দ ও সড়ক বন্ধ করে রাখার প্রতিবাদ জানান স্থানীয় বাসিন্দারা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বাগ্‌বিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে তা হাতাহাতিতে রূপ নেয়। তবে এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ কোনো মন্তব্য করেনি। গত শনিবার তেহরানের কাছে আলবোরজ প্রদেশের কারাজ শহরের বাসিন্দাদের সতর্ক করে কর্তৃপক্ষ। তাঁদের বলা হয়, জানফাদা কর্মসূচির একটি মহড়া থেকে বিস্ফোরণ ও বিকট শব্দ শোনা যেতে পারে।.গত সপ্তাহে ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় কুর্দিস্তান প্রদেশে বড় ধরনের গণসংগঠিতকরণ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। প্রদেশটির সঙ্গে ইরাকের সীমান্ত রয়েছে। আইআরজিসি-সংশ্লিষ্ট বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সি প্রাদেশিক রাজধানী সানানদাজে আয়োজিত এক শোভাযাত্রাকে শিয়া ও সুন্নি মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে ‘ঐক্যের’ মহড়া হিসেবে বর্ণনা করেছে।.বিপ্লব হলো সাইকেল চালানোর মতো। খারাপভাবে পড়ে যাওয়া এড়াতে হলে জোরে প্যাডেল চালিয়ে যেতে হয়। জানফাদা কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা ও তাঁদের নেতারা ঠিক সেটিই করার চেষ্টা করছেন।অধ্যাপক মেহরান কামরাভা, জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়.তবে দেশের বাইরে থাকা ইরানি মানবাধিকার সংগঠনগুলোর কয়েকটি এসব সশস্ত্র কর্মসূচিকে মানুষকে ‘ভয় দেখানোর’ অভিযান হিসেবে বর্ণনা করেছে। গত জানুয়ারিতে ইরানজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ হয়েছিল। ওই বিক্ষোভের কয়েক মাস পর থেকে এসব কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। জানুয়ারির বিক্ষোভে গুলি ও ছুরিকাঘাতে হাজারো বেসামরিক মানুষ নিহত হন। তাঁদের মধ্যে অনেক তরুণও ছিলেন।.হুতিদের ভান্ডারে কতটা ভয়ংকর অস্ত্র আছে, কোথা থেকে আসছে, সৌদি আরব কেন হামলা ঠেকাতে পারছে না.ইরান সরকার স্বীকার করেছে, দেশটির সব প্রদেশের ৪০০টির বেশি জেলায় বিক্ষোভ হয়েছিল। তবে সরকার এসব বিক্ষোভকে ‘অভ্যুত্থানচেষ্টা’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। সরকারের দাবি, ইরানের শাসনব্যবস্থা উৎখাত করতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল পুরোপুরি পরিকল্পিতভাবে এসব বিক্ষোভ সংগঠিত করেছিল।.এ ছাড়া জাতিসংঘের স্বাধীন তথ্য অনুসন্ধান মিশনের অনুসন্ধানও প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান সরকার। ওই মিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বিক্ষোভ দমনের সময় ইরানি কর্তৃপক্ষ মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে।.ইরানে একা ইসরায়েল আসলে কী করতে পারবে, তেহরানের সক্ষমতা কোথায়.কাতারের জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতিবিষয়ক অধ্যাপক মেহরান কামরাভা বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে আরও বিপ্লবপন্থী অংশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। আল-জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘বিপ্লব হলো সাইকেল চালানোর মতো। খারাপভাবে পড়ে যাওয়া এড়াতে হলে জোরে প্যাডেল চালিয়ে যেতে হয়। জানফাদা কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা ও তাঁদের নেতারা ঠিক সেটিই করার চেষ্টা করছেন। তাঁরা নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা ধরে রাখতে চাইছেন।’.এই অধ্যাপক আরও বলেন, ‘জানফাদার প্রশিক্ষণ ও গণসংগঠিতকরণ কর্মসূচি ইরানের নেতৃত্বের মধ্যে যাঁরা বেশি বিপ্লবপন্থী, তাঁদের জন্যও একটি সুযোগ তৈরি করেছে। এর মাধ্যমে তাঁরা পরিকল্পিত আয়োজনের মধ্য দিয়ে বিপ্লব ও এর আদর্শের প্রতি নিজেদের রাজনৈতিক ও আদর্শিক আনুগত্য প্রকাশ করতে পারছেন।’.ইরান সরকার জানিয়েছে, জানফাদা কর্মসূচির ওয়েবসাইটে ৩ কোটি ৩০ লাখ ইরানি নিবন্ধন করেছেন। তবে এই সংখ্যার পক্ষে কোনো প্রমাণ দেয়নি সরকার। এই সংখ্যা ইরানের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের বেশি। আর ১২ বছরের বেশি বয়সী নারী-পুরুষের মোট সংখ্যার অর্ধেকের বেশি।চলতি বছরের শুরুর দিকে বিদেশে অবস্থানরত কয়েকজন অধিকারকর্মী ওয়েবসাইটটির সোর্স কোডে প্রবেশ করতে সক্ষম হন। সেখানে দেখা যায়, নিবন্ধনকারীর সংখ্যা ৪০ লাখের কম।.জানফাদা কর্মসূচির উদ্দেশ্য হলো দেখানো যে সরকার যেমন জনগণকে সমর্থন করে, তেমনি জনগণও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ও ইসলামি বিপ্লবকে সমর্থন করে।নেমাতোল্লাহ বাঘেরি, আইআরজিসি কমান্ডার .ওয়েবসাইটটিতে নিবন্ধনের জন্য শুধু একটি ফোন নম্বর প্রয়োজন ছিল। জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর দেওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না।গত সপ্তাহে এই কর্মসূচির রাজনৈতিক লক্ষ্য নিয়ে কথা বলেন লোরেস্তান প্রদেশের আইআরজিসি কমান্ডার নেমাতোল্লাহ বাঘেরি। তিনি বলেন, ‘এর উদ্দেশ্য হলো দেখানো যে সরকার যেমন জনগণকে সমর্থন করে, তেমনি জনগণও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ও ইসলামি বিপ্লবকে সমর্থন করে।’ কর্মসূচির আয়োজকেরা বলেছেন, নিবন্ধন করা ব্যক্তিদের ভবিষ্যতে উদ্ধার অভিযানে কাজে লাগানো হতে পারে। সামাজিক সেবা, গণমাধ্যমসংক্রান্ত কাজ ও আর্থিক সহায়তার ক্ষেত্রেও তাঁদের ব্যবহার করা যেতে পারে।.যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ, নৌ অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার কারণে সৃষ্ট চাপ কমাতেও নিবন্ধনকারীদের সহায়তা চেয়েছে সরকার। এ জন্য তাঁদের জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য সম্পদের ব্যবহার কমানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। প্রায় আট মাস ধরে চলা ক্ষয়ক্ষতির যুদ্ধে কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। ইরানের মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার অবনতি হয়েছে। দেশের বেসামরিক অবকাঠামোর একাংশ ধ্বংস হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে জানফাদা কর্মসূচি সম্প্রসারণের চেষ্টা আরও জোরদার করেছে ইরানের শাসকগোষ্ঠী। এই কর্মসূচিতে শিশুদের বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিদ্যালয়গুলোও ক্রমেই এ ধরনের কর্মসূচি আয়োজনে সহযোগিতা করছে।.গত সপ্তাহে ইরানের শিক্ষামন্ত্রী আলিরেজা কাজেমি বলেন, বাসিজ মিলিশিয়া ‘শিক্ষার্থী জানফাদা’ হিসেবে নিবন্ধন করছে। আগামী কয়েক সপ্তাহে শিশুদের নিয়ে আরও কর্মসূচি ও অনুষ্ঠানের পরিকল্পনাও রয়েছে।জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কামরাভা বলেন, এ ধরনের গণসংগঠিতকরণ কর্মসূচি যে বৃহত্তর সমাজে সরকারের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াবে, এমন নয়। তবে তাঁর মতে, সরকারের বিদ্যমান সমর্থকদের মধ্যে এর গ্রহণযোগ্যতা আরও দৃঢ় করতে এসব কর্মসূচি ভূমিকা রাখে। কামরাভা বলেন, ‘এর মাধ্যমে সরকারের বর্তমান সমর্থকদের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা আরও গভীর হয়। বিপ্লবের আদর্শিক ও রাজনৈতিক লক্ষ্য নিয়ে তাঁদের বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়। একই সঙ্গে সব বিপ্লবপন্থীর মধ্যে যে অবরুদ্ধ হয়ে থাকার মানসিকতা রয়েছে, তা আরও শক্তিশালী ও বাস্তব রূপ পায়।’.ইরান কি হরমুজ প্রণালিতে গোপনে টোল আদায় করছে

Source: https://www.prothomalo.com/world/middle-east/ril9kyq0pv