
চরম সংকটের মুহূর্তে এক ফোঁটা শীতল পানির মতো যদি কেউ এসে গভীর মমতায় বলে, ‘হতাশ হোয়ো না, সুসংবাদ গ্রহণ করো’—তবে ভেঙে পড়া হৃদয়ও নতুন করে বেঁচে থাকার সাহস পায়। আরবিতে এই আশ্বাসবাণীকে বলা হয় ‘আবশির’ বা ‘সুসংবাদ নাও’।নবীজি এসেছিলেন মানুষের জন্য বুকভরা আশা ও সুসংবাদের বার্তা নিয়ে। আল্লাহ–তাআলা তাই তাঁর পরিচয় তুলে ধরে বলেছেন, “হে নবী, আমি তো আপনাকে পাঠিয়েছি সাক্ষ্যদাতা, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে; আর আল্লাহর অনুমতিক্রমে তাঁর দিকে আহ্বানকারী এবং উজ্জ্বল প্রদীপ হিসেবে। আর আপনি বিশ্বাসীদের সুসংবাদ দিন যে তাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে রয়েছে বিশাল অনুগ্রহ।” (সুরা আহজাব, আয়াত: ৪৫–৪৭).ইসলামের শুরুর দিনগুলোতে মক্কায় যখন একদল নিরীহ মানুষ বিশ্বাস ধরে রাখার অপরাধে নির্যাতনের শিকার হচ্ছিলেন, তখন রাসুল (সা.) তাদের তাদের এমন এক সোনালি ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, যা তখনকার বাস্তবতায় ছিল অকল্পনীয়।
.ইসলামের শুরুর দিনগুলোতে মক্কায় যখন একদল নিরীহ মানুষ বিশ্বাস ধরে রাখার অপরাধে নির্যাতনের শিকার হচ্ছিলেন, তখন রাসুল (সা.) তাদের তাদের এমন এক সোনালি ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, যা তখনকার বাস্তবতায় ছিল অকল্পনীয়।কোরাইশদের শত রক্তচক্ষুর সামনে দাঁড়িয়ে তিনি ঘোষণা করতেন, “হে লোকসকল, তোমরা বলো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ (আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই), তবেই তোমরা সফল হবে; এর মাধ্যমে তোমরা আরব জাহানের নেতৃত্ব পাবে, অনারবরাও তোমাদের কাছে নত হবে আর পরকালে তোমরা বেহেশতের অধিপতি হবে।” (ইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ১/২১৬, দারু সাদির, বৈরুত, ১৯৬৮)রাসুল (সা.) এ কথাও বলেছেন, “আমি আল্লাহর নামে সাক্ষ্য দিচ্ছি, যে বান্দা অন্তরের গভীর বিশ্বাস নিয়ে সাক্ষ্য দেবে যে আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ আল্লাহর রাসুল, তারপর ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপন করবে—সে নিশ্চিতভাবেই বেহেশতে প্রবেশ করবে।” (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২২১৮৭)তিনি আরও বলেন, “এই উম্মতকে সুসংবাদ দাও গৌরব, উচ্চ মর্যাদা, চূড়ান্ত বিজয় ও পৃথিবীতে তাদের প্রতিষ্ঠার। তবে তাদের মধ্য থেকে যে ব্যক্তি আখেরাতের কাজ পার্থিব লাভের জন্য করবে, পরকালে তার কোনো অংশ থাকবে না।” (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২১২৮৮).পবিত্র কোরআনের পাঁচটি আশার আলো ছড়ানো আয়াত.খন্দকের যুদ্ধের সময় তীব্র শীত, খাদ্যাভাব আর চারপাশের ভীতি—সব মিলিয়ে মুসলিমরা গভীর উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছিলেন। আত্মরক্ষার জন্য মদিনার চারপাশে গভীর পরিখা খনন করা হচ্ছিল। হঠাৎ খননকাজে একটি বিশাল ও দুর্ভেদ্য পাথর বাধা হয়ে দাঁড়াল। সাহাবিরা নবীজির কাছে এসে বিষয়টি জানালে তিনি নিজেই শাবল হাতে খন্দকে নামলেন।বিসমিল্লাহ বলে তিনি প্রথম আঘাত করতেই একখণ্ড পাথর ভেঙে গেল এবং এক অদ্ভুত আলোকচ্ছটা ঠিকরে বের হলো। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকবির দিয়ে উঠলেন, “আল্লাহু আকবার, আমাকে শামের (সিরিয়া) চাবিকাঠি দেওয়া হয়েছে; আল্লাহর কসম, আমি এই মুহূর্তে সেখান থেকে রোমানদের লাল প্রাসাদগুলো স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি!”এরপর দ্বিতীয় আঘাতেই আরেকটি অংশ ভেঙে গেল এবং তিনি ঘোষণা করলেন, “আল্লাহু আকবার, আমাকে পারস্যের চাবিকাঠি দেওয়া হয়েছে; আল্লাহর কসম, আমি মাদায়েনের সাদা রাজপ্রাসাদ দেখতে পাচ্ছি।”তৃতীয় আঘাতেই পুরো পাথরটি চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল এবং তিনি বললেন, “আল্লাহু আকবার, আমাকে ইয়েমেনের চাবিকাঠি দেওয়া হয়েছে; আমি এখান থেকেই সানআর তোরণগুলো দেখতে পাচ্ছি।” (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ৩১৭৩).অতএব সুসংবাদ দাও আমার সেই বান্দাদের, যারা মনোযোগ দিয়ে কথা শোনে এবং তার মধ্য থেকে যা সর্বোত্তম, তা অনুসরণ করে। এরাই তারা, যাদের আল্লাহ সঠিক পথ দেখিয়েছেন এবং এরাই প্রকৃত বুদ্ধিমান।সুরা জুমার, আয়াত: ১৭–১৮.মুনাফিকরা উপহাস করে বলতে লাগল, যেখানে প্রাণ বাঁচানোর নিশ্চয়তা নেই, সেখানে এত বড় স্বপ্ন দেখা নিছক পাগলামি; পবিত্র কোরআনে তাদের এই মনোভাব তুলে ধরা হয়েছে, “মুনাফিক ও যাদের অন্তরে ব্যাধি ছিল তারা বলছিল, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল আমাদের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তা তো প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়।” (সুরা আহজাব, আয়াত: ১২)কিন্তু যাদের অন্তরে বিশ্বাস খাঁটি ছিল, তারা এই কঠিন পরিস্থিতিতেও ভরসা হারাননি। তাঁরা শত্রুবাহিনী দেখে দৃঢ়কণ্ঠে বলেছিলেন, “আল্লাহ ও তাঁর রাসুল তো আমাদের এই প্রতিশ্রুতিই দিয়েছিলেন এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সত্য বলেছেন; আর এ পরিস্থিতি তাদের বিশ্বাস ও আনুগত্যকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল।” (সুরা আহজাব, আয়াত: ২২)ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মাত্র কয়েক দশকের ব্যবধানে নবীজির সেই সুসংবাদের প্রতিটি বর্ণ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়িত হয়েছিল।.সুরা ফাতহে মক্কা বিজয়ের সুসংবাদ.কোনো দায়িত্ব দিয়ে সাহাবিদের কোথাও পাঠানোর সময় তিনি একটি মূলনীতি শিখিয়ে দিতেন, “তোমরা মানুষের মাঝে সুসংবাদ ছড়িয়ে দাও, তাদের মনে বিরক্তি বা ভয় তৈরি কোরো না; মানুষের পথ সহজ করো, তাদের জন্য বিষয়গুলোকে জটিল কোরো না।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৭৩২)তিনি মানুষকে উপদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রেও বিবেক ও বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের কথা বলতেন। পবিত্র কোরআনে তাদের জন্য এক অনন্য সুসংবাদ এসেছে, “অতএব সুসংবাদ দাও আমার সেই বান্দাদের, যারা মনোযোগ দিয়ে কথা শোনে এবং তার মধ্য থেকে যা সর্বোত্তম, তা অনুসরণ করে। এরাই তারা, যাদের আল্লাহ সঠিক পথ দেখিয়েছেন এবং এরাই প্রকৃত বুদ্ধিমান।” (সুরা জুমার, আয়াত: ১৭–১৮).অন্যের মন খারাপের দিনে একটু হাসিমুখে কথা বলা, কাউকে আশার বাণী শোনানো কিংবা ‘সব ঠিক হয়ে যাবে’ বলে সাহস জোগানো শুধু সামাজিক সৌজন্য নয়; এটি নবীজির এক জীবন্ত আদর্শ।.উম্মুল আলা নামের এক নারী সাহাবি একবার মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। রাসুল (সা.) তাঁকে দেখতে গিয়ে মমতামাখা কণ্ঠে বলেছিলেন, “সুসংবাদ নাও, হে উম্মুল আলা, কেননা একজন মুসলমানের অসুস্থতার কারণে আল্লাহ তার গুনাহগুলোকে এমনভাবে দূর করে দেন, যেভাবে আগুন সোনা ও রুপার খাঁদ পুড়িয়ে দূর করে দেয়।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩০৯২)অন্যের মন খারাপের দিনে একটু হাসিমুখে কথা বলা, কাউকে আশার বাণী শোনানো কিংবা ‘সব ঠিক হয়ে যাবে’ বলে সাহস জোগানো শুধু সামাজিক সৌজন্য নয়; এটি নবীজির এক জীবন্ত আদর্শ। মানুষের মন থেকে ভীতি দূর করে ভালোবাসা ও বিশ্বাসের আলো ছড়ানোই হোক আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের পথচলা।.‘সুসংবাদ দাও, ভয় দেখিয়ো না’
Source: https://www.prothomalo.com/religion/islam/57kj0shvq2