
বাংলাদেশের রংপুরের একটি কারখানা জিতে নিয়েছে বিশ্বের সেরা নতুন ভবনের পুরস্কার। কারখানাটির নাম গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরি। সাততলা এই ভবনে তৈরি হয় কার্পেট ও শতরঞ্জি। তবে এর বিশেষত্ব হলো উৎপাদনের পাশাপাশি শ্রমিকদের জন্য সুন্দর, আরামদায়ক ও পরিবেশবান্ধব কর্মপরিবেশ গড়ে তোলা।বৃহস্পতিবার লন্ডনে রয়্যাল ইনস্টিটিউট অব ব্রিটিশ আর্কিটেক্টস (আরআইবিএ) কারখানাটিকে এই পুরস্কার দিয়েছে। বিচারকদের ভাষায়, এটি ‘শান্ত নম্রতার কাজ’। অর্থাৎ চোখধাঁধানো নকশা দিয়ে সবাইকে চমকে দেওয়ার বদলে ভবনটি তৈরি করা হয়েছে মানুষের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়ে।কারখানাটির নকশা করেছেন স্থপতি বায়েজিদ মাহবুব খন্দকার। তিনি ঢাকার নকশাবিদ আর্কিটেক্টসের প্রধান স্থপতি। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে ১৯৯৬ সালে স্থাপত্যে স্নাতক সম্পন্ন করেন তিনি। কিছুদিন সরকারি চাকরি করার পর নিজের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তাঁর নকশায় সাধারণত স্থানীয় ইতিহাস, মানুষের প্রয়োজন ও পরিবেশের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। এই কারখানার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বায়েজিদ মাহবুবের ভাষায়, ‘আমরা একটা সহজ প্রশ্ন করেছিলাম—কারখানা যদি প্রথমে সেখানে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের বাড়ি হিসেবে বানানো হয়?’.বিশ্বের সবচেয়ে বড় লাইব্রেরি.এই ভাবনা থেকেই কারখানাটিতে রাখা হয়েছে উঠান, পুকুর ও বারান্দা। দেয়ালে রয়েছে গাছপালা। ভবনের নকশা এমনভাবে করা হয়েছে, যাতে প্রাকৃতিক আলো ও বাতাস চলাচল করতে পারে। ছাদে আছে শিশুদের দেখাশোনার জন্য ডে-কেয়ার কেন্দ্র, পাশাপাশি চিকিৎসার ব্যবস্থাও রয়েছে। আরও একটি বিষয় লক্ষ করার মতো। শ্রমিক, ব্যবস্থাপক ও মালিক, সবাই একই দরজা দিয়ে কারখানায় প্রবেশ করেন। প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ এখানে কাজ করেন, যাঁদের বেশির ভাগই নারী। তাঁদের কাজের পরিবেশ ও দৈনন্দিন প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখেই এসব ব্যবস্থা করা হয়েছে।এই কারখানার পেছনে রয়েছেন কারুপণ্য রংপুর লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা শফিকুল আলম সেলিম। ১৯৯১ সালে তিনি রংপুরে হারিয়ে যেতে বসা শতরঞ্জি তৈরির কাজ নতুন করে শুরু করেন। ছোট পরিসরে শুরু হওয়া সেই উদ্যোগ আজ বড় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে, যেখানে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন হাজার হাজার মানুষ। ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পকে এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রের নকশায়ও নতুন চিন্তার পরিচয় দিয়েছেন তিনি।কারখানাটি নিয়ে এর আগে প্রথম আলোতে লিখেছিলেন লেখক আনিসুল হক। সেখানে তিনি ভবনটির গাছপালায় ঢাকা কাঠামো এবং নিচের প্রায় ১৫ হাজার বর্গফুটের জলাধারের কথা উল্লেখ করেছিলেন। জলাধারের ওপর দিয়ে আসা বাতাস কারখানার ভেতর প্রবেশ করে, ফলে ভবনটি প্রাকৃতিকভাবে ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে। স্থপতি বায়েজিদ মাহবুবের নকশার প্রশংসা করে আনিসুল হক লিখেছিলেন, ‘শুধু এই স্থাপত্যকর্ম করার দুঃসাহসের জন্যই সেলিমকে এবং এটাকে বাস্তবায়িত করার জন্য বায়েজিদ মাহবুবকে আমি এক শবার সালাম জানাই।’ তাঁর প্রশ্ন ছিল, শিল্প গড়ে তোলার পাশাপাশি শিল্পকলা ও পরিবেশের কথা ভাবার সাহসই-বা কজন দেখান?.এভারেস্টের চেয়ে উঁচু কোনো পর্বত কি কখনো ছিল.বাংলাদেশে কারখানার কথা উঠলে অনেকের মনে পড়ে ২০১৩ সালের রানা প্লাজার ভবনধসের ঘটনা। ওই দুর্ঘটনায় এক হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। সেই ভয়াবহ ঘটনার বিপরীতে রংপুরের এই কারখানা দেখাচ্ছে, কর্মক্ষেত্রের নকশায় মানুষের নিরাপত্তা, স্বাচ্ছন্দ্য ও মর্যাদাকে গুরুত্ব দেওয়া কতটা জরুরি। একটি কারখানা শুধু উৎপাদনের জায়গা নয়, সেখানে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের জন্যও সুন্দর পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব।লন্ডনে পুরস্কার পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আনন্দ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে একটি ভিন্ন ধরনের কর্মক্ষেত্র গড়ে তোলার স্বীকৃতি পাওয়া গর্বের বিষয়। আরআইবিএর প্রেসিডেন্টও বলেছেন, এই কারখানা দেখিয়েছে, সুচিন্তিত স্থাপত্যনকশার মাধ্যমে সামাজিক বৈষম্য কমাতে ভূমিকা রাখা সম্ভব।এর আগে বাংলাদেশের আরেকটি স্থাপনা এই পুরস্কার পেয়েছিল। সাতক্ষীরার ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল। এবার সেই স্বীকৃতি এল রংপুরের গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরির হাত ধরে। বাংলাদেশের স্থাপত্য যে মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করার পাশাপাশি পরিবেশের কথাও ভাবতে পারে, এই অর্জন তারই প্রমাণ।একটি কারখানা যে শুধু কাজ করানোর জায়গা নয়, বরং মানুষের জন্য সুন্দর ও মানবিক পরিবেশ তৈরির জায়গাও হতে পারে, রংপুরের এই কারখানা সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়।সূত্র: সিএনএন, রয়্যাল ইনস্টিটিউট অব ব্রিটিশ আর্কিটেক্টস (আরআইবিএ) ও প্রথম আলো।.খেলাধুলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত মানুষের পাশে শি
প্রকাশক ও সম্পাদক : সুমন তানভীর
Copyright © 2026 প্রকাশ নিউজ. All rights reserved.