
লস অ্যাঞ্জেলেসের বাংলাদেশি-আমেরিকান কমিউনিটিতে নতুন নেতৃত্বের পথচলা শুরু হলো ঐক্যের বার্তা দিয়ে। শুধু একটি সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনা নয়, বৃহত্তর বাংলাদেশি কমিউনিটিকে আরও সংগঠিত, কার্যকর ও শক্তিশালী করার প্রত্যয় নিয়ে প্রথম সাধারণ সভায় নিজেদের কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেছে বাংলাদেশ ইউনিটি ফেডারেশন অব লস অ্যাঞ্জেলেস (বাফলা)। বাফলা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেস এলাকার প্রবাসী বাংলাদেশিদের ৩১টি সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত একটি ফেডারেশন। এই ৩১টি সংগঠনকে সঙ্গে নিয়ে বৃহত্তর বাংলাদেশি-আমেরিকান কমিউনিটির মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো, তরুণ ও নারীদের নেতৃত্বে আনা এবং কমিউনিটির মানুষের প্রয়োজনে বাফলার কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়েছে নতুন নেতৃত্ব। দীর্ঘদিন ধরে এসব সংগঠনকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করে আসা বাফলার নতুন কমিটির প্রথম সাধারণ সভায় এবার আরও বিস্তৃত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কমিউনিটি গড়ার প্রত্যয় উঠে এসেছে। গত শুক্রবার (২১ আগস্ট) রাতে লস অ্যাঞ্জেলেসে বাফলার কার্যালয়ে নতুন কমিটির প্রথম সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত চলা এই সভায় বাফলার নির্বাহী কমিটির (ইসি) সদস্য, বোর্ড অব ট্রাস্টি, উপদেষ্টামণ্ডলী, বিভিন্ন কমিটির সদস্য, সদস্য সংগঠনের প্রতিনিধিসহ কমিউনিটির গণ্যমান্য ব্যক্তি ও অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন। মাগরিবের নামাজের মধ্য দিয়ে শুরু হয় সন্ধ্যার কার্যক্রম। এরপর নৈশভোজ ও পারস্পরিক মতবিনিময় শেষে শুরু হয় আনুষ্ঠানিক সাধারণ সভা। সভায় বাফলার বর্তমান অবস্থা, নতুন মেয়াদের কর্মপরিকল্পনা, সাংগঠনিক অগ্রাধিকার এবং বৃহত্তর বাংলাদেশি-আমেরিকান কমিউনিটির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হয়।.সভায় ‘স্টেট অব দ্য ফেডারেশন’ বক্তব্যে বাফলার ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনার বিস্তারিত তুলে ধরেন সভাপতি ইলিয়াস এম সিকদার। বাফলার সঙ্গে নিজের দীর্ঘ পথচলার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২০১২–১৩ মেয়াদে সাংগঠনিক সম্পাদক এবং ২০১৬–১৭ মেয়াদে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। এবার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পাওয়াকে তিনি সম্মান ও বড় দায়িত্ব হিসেবে দেখছেন।ইলিয়াস সিকদার বলেন, বাফলা কোনো ব্যক্তি বা একটি ক্যাবিনেটের সংগঠন নয়; এটি পুরো কমিউনিটির। প্রজন্মের পর প্রজন্মের মানুষের সময়, শ্রম, অর্থ, চিন্তা ও নেতৃত্বের মাধ্যমে বাফলা গড়ে উঠেছে। তাই নতুন মেয়াদে ব্যক্তিগত পার্থক্য ও বিভাজন পাশে রেখে কমিউনিটির বৃহত্তর স্বার্থে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।সভাপতি বলেন, বাফলার সামনে তিনটি বড় লক্ষ্য—কমিউনিটি গড়ে তোলা, বাফলার প্রতিষ্ঠানকে সুরক্ষিত রাখা এবং সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করা। তাঁদের লক্ষ্য নিজেদের জন্য কাজ করা নয়, কমিউনিটির জন্য কাজ করা। বাফলার সাংগঠনিক কার্যক্রমে গণতন্ত্র, সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধা, উন্মুক্ত যোগাযোগ ও দলগতভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।.সভাপতির মতে, একটি সংগঠনে সবাই সব বিষয়ে একমত হবেন—এমনটি স্বাভাবিক নয়। মতের পার্থক্য থাকতেই পারে। তবে ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ থাকতে হবে এবং একই সঙ্গে একে অপরের প্রতি সম্মান ও সংগঠনের সংবিধান মেনে চলতে হবে।আর্থিক অবদানের ক্ষেত্রেও সমতার কথা বলেন সভাপতি। কেউ অর্থ দিয়ে, কেউ সময় দিয়ে, কেউ পেশাগত দক্ষতা দিয়ে, কেউ সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা দিয়ে এবং কেউ নেপথ্যে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কমিউনিটিতে অবদান রাখেন। তাঁর মতে, প্রতিটি অবদানেরই মূল্য রয়েছে।নতুন নেতৃত্বের প্রতি তাঁর আহ্বান—সবাইকে সঙ্গে নিয়ে নেতৃত্ব দিতে হবে, একসঙ্গে কাজ করতে হবে এবং সম্মিলিত সাফল্য নিশ্চিত করতে হবে। নতুন ক্যাবিনেটের সদস্যদের পরিচয় তুলে ধরে সভাপতি ইলিয়াস সিকদার বলেন, তিনি একটি দক্ষ, উদ্যমী ও নিবেদিত দল পেয়েছেন।ভাইস প্রেসিডেন্ট দাউদ বাফাতিয়া, সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ নাসির জেবুল, অর্থ সম্পাদক ডা. রাসেল মাহমুদ জুয়েল, সাংগঠনিক সম্পাদক খোরশেদ আলম রতন, জনসংযোগ সম্পাদক মাসুক আল রায়হান এবং সাংস্কৃতিক সম্পাদক শায়লা রুমী—প্রত্যেকের অভিজ্ঞতা ও ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন তিনি।.তবে ক্যাবিনেটের পরিচয় দিতে গিয়ে সভাপতি একটি বিষয় স্পষ্ট করে দেন, ‘এটি প্রেসিডেন্টের ক্যাবিনেট নয়, বাফলার ক্যাবিনেট।’ নতুন নেতৃত্বের সাফল্য একজন ব্যক্তি বা একটি পদ দিয়ে নয়; বরং সম্মিলিতভাবে কী করা হলো—তার ভিত্তিতেই নির্ধারিত হবে বলে তিনি জানান।নতুন মেয়াদে বাফলার অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির কথা উল্লেখ করেন সভাপতি। বাফলার সংবিধানের বিধান অনুযায়ী একটি ফাইন্যান্সিয়াল ওভারসাইট কমিটি গঠনের পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। এই কমিটির মাধ্যমে বাফলার আর্থিক কার্যক্রমের ওপর নজরদারি জোরদার করার কথা বলা হয়। এর মধ্যে ভাড়া সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনা, বাংলাদেশ ডে প্যারেডের ব্যয়, অন্যান্য সাংগঠনিক ব্যয় এবং দাতব্য কার্যক্রমের ব্যয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে।সভাপতির বক্তব্যে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং বাফলার সম্পদের দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে আর্থিক, হিসাবরক্ষণ, ব্যবসা ও সাংগঠনিক কাজে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের পাশাপাশি তরুণ স্বেচ্ছাসেবকদের সম্পৃক্ত করার কথা বলেন তিনি। তাঁর মতে, অভিজ্ঞতা ও নতুন উদ্যম—দুটিই দরকার। .বাফলার নবনির্বাচিত কমিটির শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত.বাফলার নতুন সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ নাসির জেবুল তাঁর বক্তব্যে নতুন মেয়াদের অগ্রাধিকারগুলো তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাফলা শুধু একটি সংগঠনের নাম নয়; এটি বাংলাদেশি কমিউনিটির ঐক্য, পারস্পরিক সহযোগিতা ও দায়বদ্ধতার একটি প্ল্যাটফর্ম। নতুন মেয়াদে তিনি পাঁচটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেন—ঐক্য, সামাজিক ও মানবিক কার্যক্রম, নতুন প্রজন্ম, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি এবং সব শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ।ঐক্যের প্রসঙ্গে জেবুল বলেন, মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক; কিন্তু ব্যক্তিগত মত, রাজনৈতিক মত কিংবা ভিন্ন অবস্থান যেন কমিউনিটির ঐক্যকে দুর্বল না করে। তিনি বলেন, ‘আমরা ভিন্নমতের হতে পারি; কিন্তু আমাদের কমিউনিটি এক।’ বাফলার দরজা সবার জন্য খোলা বলেও উল্লেখ করেন তিনি।সৈয়দ নাসির জেবুলের মতে, বাফলা কোনো একজন ব্যক্তি বা কয়েকজন মানুষের সংগঠন নয়, বাফলা সবার সংগঠন। নতুন নেতৃত্ব বাফলার কার্যক্রমকে শুধু অনুষ্ঠাননির্ভর রাখতে চায় না। কমিউনিটির কোনো মানুষ বিপদে পড়লে, অসুস্থ হলে কিংবা আর্থিক বা অন্য কোনো সমস্যায় পড়লে যতটা সম্ভব পাশে দাঁড়ানোর পরিকল্পনার কথা বলেন জেবুল। বিশেষ করে জরুরি মানবিক সহায়তা ও দাতব্য কার্যক্রম আরও সুসংগঠিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।নতুন প্রজন্মের বিষয়টিও সভায় বিশেষ গুরুত্ব পায়। যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া ও বেড়ে ওঠা বাংলাদেশি পরিবারের সন্তানদের বাংলাদেশের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত রাখা এবং একই সঙ্গে তাদের নেতৃত্বের জন্য প্রস্তুত করার ওপর জোর দেওয়া হয়।.বাফলার অন্যতম বড় কর্মসূচি ‘বাংলাদেশ ডে প্যারেড’ও নতুন মেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ স্থান পাবে বলে জানানো হয় সভায়। কমিটির মতে, বাংলাদেশ ডে প্যারেড শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়; এটি বাংলাদেশি কমিউনিটির ঐক্য, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতীক। সংগঠন, পরিবার, শিশু, তরুণ, প্রবীণ, পেশাজীবী ও ব্যবসায়ী—সবাইকে এই আয়োজনে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্য থাকবে।বৈঠকে জানানো হয়, শুধু পরবর্তী প্রজন্ম নিয়ে কথা বললে হবে না; পরবর্তী প্রজন্মকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য প্রস্তুত করতে হবে। মেন্টরশিপ, পেশাগত নেটওয়ার্কিং, ক্যারিয়ার সুযোগ ও নেতৃত্ব বিকাশের কর্মসূচির পাশাপাশি ক্যালিফোর্নিয়া বাংলাদেশি ইয়ুথ কনভেনশনের মতো উদ্যোগ নিয়েও কাজ করার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। নারীদেরও কমিউনিটির কর্মকাণ্ডে আরও অর্থবহভাবে সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।.নতুন নেতৃত্বের বক্তব্যে উঠে এসেছে বাফলার ভূমিকা শুধু সদস্য সংগঠনগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রাখার পরিকল্পনা। কোনো বাংলাদেশি-আমেরিকান সংগঠন কমিউনিটির জন্য ইতিবাচক কোনো কাজ করলে বাফলার উচিত সম্ভব হলে সেই উদ্যোগকে সহযোগিতা ও প্রচার করা—এমন অবস্থান তুলে ধরেন সভাপতি।দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার বিভিন্ন বাংলাদেশি সংগঠনের কর্মসূচির মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে একটি কমিউনিটি ক্যালেন্ডার চালুর পরিকল্পনার কথাও সভায় তুলে ধরা হয়। এসব ভাবনা থেকেই বাফলাকে ‘সেতু, বাধা নয়’ হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন নতুন নেতৃত্ব।.লস অ্যাঞ্জেলেসের বাংলাদেশি-আমেরিকান কমিউনিটির ৩১টি সংগঠনকে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে বাফলা। নতুন নেতৃত্ব এই সংগঠনগুলোর মধ্যে আরও সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।কমিউনিটির রয়েছে মানুষ, মেধা, ব্যবসা, পেশাজীবী, সংগঠন, তরুণ প্রজন্ম এবং অভিজ্ঞতা; কিন্তু এসব শক্তিকে একত্র করে বৃহত্তর সামাজিক শক্তিতে রূপ দিতে দরকার আরও ভালো সমন্বয়, যোগাযোগ ও অংশীদারত্ব—সভায় এমন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা হয়।সবাই একসঙ্গে কাজ করতে পারলে ক্যালিফোর্নিয়ার অন্যতম শক্তিশালী, সংগঠিত ও সম্মানজনক বাংলাদেশি-আমেরিকান কমিউনিটি গড়ে তোলা সম্ভব বলে আশাবাদ ব্যক্ত করে নতুন ক্যাবিনেট।.সভায় ভাইস প্রেসিডেন্ট দাউদ বাফাতিয়া, অর্থ সম্পাদক ডা. রাসেল মাহমুদ জুয়েল, সাংগঠনিক সম্পাদক খোরশেদ আলম রতন, জনসংযোগ সম্পাদক মাসুক আল রায়হান ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক শায়লা রুমীসহ বাফলার ইসি সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া বাফলার বোর্ড অব ট্রাস্টি, উপদেষ্টামণ্ডলী, বিভিন্ন কমিটির সদস্য এবং ৩১টি সদস্য সংগঠনের প্রতিনিধিরাও অংশ নেন।উপস্থিত ব্যক্তিদের মধে৵ ছিলেন মাহবুব খান, জিয়াউর রহমান, রফিকুল ইসলাম, মোহাম্মদ হান্নান, ডা. আবুল হাশেম, বদরুল এ চৌধুরী, এম ওয়াহিদ রহমান, মাহবুবুর রহমান, শিপার চৌধুরী, হাবিব আহমেদ টিয়া, মোর্শেদ আলম, আবুল হাসনাত রায়হানসহ কমিউনিটির বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিরা।
প্রকাশক ও সম্পাদক : সুমন তানভীর
Copyright © 2026 প্রকাশ নিউজ. All rights reserved.