
ইসলাম মানুষের আর্থিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ভারসাম্য, দায়িত্বশীলতা ও সততার শিক্ষা দেয়। ঋণ গ্রহণও এর ব্যতিক্রম নয়।প্রয়োজনের সময় ঋণ নেওয়া বৈধ হলেও এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও সতর্কতা। তাই ঋণ নেওয়ার আগে এবং নেওয়ার পর একজন মুমিনের কয়েকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি।১. প্রয়োজন ছাড়া ঋণ না নেওয়া ঋণ কখনো মানুষের বিপদে সহায় হতে পারে। কিন্তু অপ্রয়োজনে ঋণ নিলে সেটিই একসময় বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।রাসুল (সা.) ঋণের বোঝা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতেন। তিনি দোয়া করতেন, ‘হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে পাপ ও ঋণের বোঝা থেকে আশ্রয় চাই।’ সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, আপনি ঋণ থেকে এত বেশি আশ্রয় চান কেন?’ তিনি বলেন, ‘মানুষ যখন ঋণগ্রস্ত হয়, তখন কথা বললে মিথ্যা বলে এবং প্রতিশ্রুতি দিলে তা ভঙ্গ করে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৩৯৭)তাই বিলাসিতা, লোকদেখানো জীবনযাপন কিংবা অপ্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণের জন্য ঋণ নেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত। একজন মুমিনের সৌন্দর্য হলো, নিজের সামর্থ্যের মধ্যে সন্তুষ্ট থাকা এবং আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা।.ঋণ নেওয়ার সময় মনে রাখতে হবে, এটি কোনো অনুগ্রহ নয়; বরং একটি আমানত ও দায়িত্ব। তাই ঋণ নেওয়ার আগেই তা যথাসময়ে পরিশোধের আন্তরিক নিয়ত থাকা জরুরি।.ঋণ থেকে মুক্তির জন্য যে আমল করবেন.২. পরিশোধের দৃঢ় সংকল্প থাকাঋণ নেওয়ার সময় মনে রাখতে হবে, এটি কোনো অনুগ্রহ নয়; বরং একটি আমানত ও দায়িত্ব। তাই ঋণ নেওয়ার আগেই তা যথাসময়ে পরিশোধের আন্তরিক নিয়ত থাকা জরুরি।রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মানুষের সম্পদ নেয় তা পরিশোধ করার ইচ্ছায়, আল্লাহ তার পক্ষ থেকে তা পরিশোধের ব্যবস্থা করে দেন। আর যে ব্যক্তি তা ধ্বংস করার ইচ্ছায় নেয়, আল্লাহ তাকে ধ্বংস করেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৩৮৭)৩. ঋণের বিষয়টি লিখে রাখাঋণ যতই কাছের মানুষ থেকে নেওয়া হোক, তার হিসাব পরিষ্কার রাখা উচিত। কত টাকা নেওয়া হলো, কখন তা পরিশোধ করতে হবে এবং কীভাবে পরিশোধ করা হবে—এসব বিষয় লিখিতভাবে সংরক্ষণ করা উত্তম।আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ, যখন তোমরা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পরস্পরের মধ্যে ঋণের লেনদেন করো, তখন তা লিখে রাখো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৮২)ঋণের হিসাব লিখে রাখা অবিশ্বাসের লক্ষণ নয়; বরং এটি আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলার একটি মাধ্যম। এতে ভবিষ্যতে ভুল বোঝাবুঝি, সন্দেহ ও সম্পর্কের টানাপোড়েন থেকে উভয় পক্ষই নিরাপদ থাকতে পারে।৪. সুদ থেকে বেঁচে থাকাঋণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতার বিষয় হলো সুদ। ইসলামে সুদ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।কোরআনে এসেছে, ‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৭৫)আরও বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সুদের যা অবশিষ্ট আছে, তা ছেড়ে দাও।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৭৮)আধুনিক যুগে ঋণ নেওয়ার বিভিন্ন পদ্ধতি ও আর্থিক ব্যবস্থা চালু রয়েছে। কিন্তু সবধরনের ঋণ ও চুক্তি ইসলামে অনুমোদিত নয়। তাই ঋণ নেওয়ার আগে চুক্তির শর্তগুলো ভালোভাবে যাচাই করা উচিত। কোনো বিষয়ে সন্দেহ থাকলে অভিজ্ঞ আলেমের পরামর্শ নেওয়া উত্তম।.সুদ সম্পর্কে কোরআনের আয়াত.আর ঋণগ্রহীতা যদি অসচ্ছল হন, তবে সচ্ছল হওয়া পর্যন্ত তাকে অবকাশ দাও। আর যদি তোমরা সদকা (ক্ষমা) করে দাও, তবে তা তোমাদের জন্য আরও উত্তম, যদি তোমরা জানতে।সুরা বাকারা, আয়াত: ২৮০.৫. প্রয়োজনমতো ঋণ গ্রহণ করা যতটুকু প্রয়োজন, তার চেয়ে বেশি ঋণ নেওয়া উচিত নয়। কারণ অতিরিক্ত অর্থ হাতে এলে অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় খরচের প্রবণতা বেড়ে যায়। ফলে প্রয়োজনের জন্য নেওয়া ঋণের একটি অংশও অনাবশ্যক খাতে ব্যয় হয়ে যেতে পারে।কোরআনে আল্লাহ-তাআলা ব্যয়ের ক্ষেত্রে ভারসাম্যের শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘তোমার হাত গলায় বেঁধে রেখো না এবং একেবারে পুরোপুরি প্রসারিতও করো না।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ২৯)অর্থাৎ অপচয় যেমন কাম্য নয়, তেমনি প্রয়োজনীয় জায়গায় ব্যয় করতেও কৃপণতা করা উচিত নয়। ঋণের ক্ষেত্রেও একই ভারসাম্য প্রয়োজন।৬. নির্ধারিত সময়ে ঋণ শোধ করা ঋণ গ্রহণের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো তা নির্ধারিত সময়ে পরিশোধ করা। ঋণদাতার অর্থ আটকে রেখে নিজের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া কিংবা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও পরিশোধে গড়িমসি করা ইসলামের শিক্ষা নয়।রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘সচ্ছল ব্যক্তির ঋণ পরিশোধে টালবাহানা করা অন্যায়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২২৮৮)ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির প্রতি সহানুভূতিশীল হোনইসলাম ঋণগ্রহীতাকে যেমন দায়িত্বশীল হতে বলেছে, তেমনি ঋণদাতাকেও দয়া ও মানবিকতার শিক্ষা দিয়েছে। আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘আর ঋণগ্রহীতা যদি অসচ্ছল হন, তবে সচ্ছল হওয়া পর্যন্ত তাকে অবকাশ দাও। আর যদি তোমরা সদকা (ক্ষমা) করে দাও, তবে তা তোমাদের জন্য আরও উত্তম, যদি তোমরা জানতে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৮০)তাই কোনো মানুষ সত্যিই অসচ্ছল হয়ে পড়লে তাকে অপমান করা, মানুষের সামনে হেয় করা কিংবা অমানবিক চাপ দেওয়া উচিত নয়। বরং তাকে সময় দেওয়া এবং সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করা একজন মুমিনের মহৎ চরিত্রের পরিচয়।হয়তো আজ সে আপনার কাছে ঋণী; কিন্তু পরিস্থিতি আগামীকাল আপনাকেও তার অবস্থানে দাঁড় করাতে পারে। মানুষের প্রতি দয়া করলে আল্লাহর রহমতের আশা করা যায়।রায়হান আল ইমরান: লেখক ও গবেষক.জাকাত ও ওয়াকফ: ত্রাণ থেকে টেকসই উন্নয়নের ভাবনা
Source: https://www.prothomalo.com/religion/islam/7kzhanc08i