‘কে জানত, সেটিই হবে শেষ দেখা!’—ফ্রান্সে বিস্ফোরণে নিহত শিশুর স্বজনের আহাজারি

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: September 7, 2026

‘তিন মাস আগেও মা-বাবার সঙ্গে দেশে এসেছিল নাহিল। গ্রামের বাড়িতে ছিল ২৮ দিন। আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা হয়েছে, চাচাতো ভাইবোনদের সঙ্গে খেলেছে। ভাঙা ভাঙা বাংলায় কথা বলত। কে জানত, সেটিই হবে আমাদের সঙ্গে তার শেষ দেখা!’কথাগুলো বলতে বলতে কণ্ঠ ভারী হয়ে আসছিল হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার কাটখাল গ্রামের ফরিদ মিয়ার (৪৫)। চোখের সামনে ভেসে উঠছিল সাড়ে তিন বছরের ফুটফুটে ভাতিজা নাহিলের মুখ। ফ্রান্সের প্যারিসের একটি ভবনে ভয়াবহ গ্যাস বিস্ফোরণে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে প্রাণ হারায় শিশুটি।.২০১০ সালে ফ্রান্সে পাড়ি জমান হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার কাটখাল গ্রামের জলাই মিয়ার ছেলে রাসেল আহমদ (৩৫)। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ফ্রান্সে বসবাস করছেন এবং সেখানে ব্যবসা করেন। ২০১৯ সালে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত লিজা হকের (৩০) সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। লিজার বাড়ি রাজশাহীতে। তাঁদের সংসারে জন্ম নেয় একমাত্র সন্তান নাহিল।সাড়ে তিন বছরের নাহিলকে ঘিরেই ছিল তাঁদের ছোট্ট সংসারের সব আনন্দ ও স্বপ্ন। বাবা ব্যবসার কাজে দিনের বেশির ভাগ সময় বাইরে থাকতেন। মা লিজা একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করায় তাঁকেও প্রতিদিন সকালে কর্মস্থলে যেতে হতো। তাই কর্মজীবী এই দম্পতির একমাত্র সন্তান নাহিল দিনের অধিকাংশ সময় কাটাত তার নানির কাছে।৫ সেপ্টেম্বর সকালেও প্রতিদিনের মতো কাজে যাওয়ার আগে নাহিলকে নানির বাসায় রেখে যান লিজা। স্থানীয় প্রবাসী ও ফরাসি সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, রাত সাড়ে ৯টার দিকে প্যারিসের উত্তর শহরতলির ওভারভিলিয়ে শহরের একটি দোতলা ভবনে গ্যাস থেকে বিস্ফোরণ ঘটে।.ভবনটি ছিল নাহিলের নানা-নানির বাসার পাশের ভবন। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ভবনের একটি কক্ষে গ্যাসের লিকেজ থেকে বিস্ফোরণের সূত্রপাত। বিস্ফোরণে ভবনের বড় একটি অংশ মুহূর্তের মধ্যেই ধসে পড়ে। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে ধ্বংসস্তূপ।খবর পেয়ে ফরাসি দমকল বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্য ঘটনাস্থলে ছুটে যান। বিশেষ প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী কুকুরের সহায়তায় রাতভর চলে উদ্ধার অভিযান। পরে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে উদ্ধার করা হয় শিশু নাহিলের নিথর দেহ।ওই দুর্ঘটনায় নাহিলের নানা এমদাদুল হক (৬৫), নানি সালমা হক (৫৫) এবং দুই খালা রাহা হক (৩৫) ও ইয়ামা হকসহ (১৮) আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন। তাঁদের স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নাহিলের দুই খালা ও নানির অবস্থা আশঙ্কাজনক।.আজ সোমবার সকালে কাটখাল গ্রামে নাহিলদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পুরো বাড়িতে নীরবতা, স্বজনদের চোখেমুখে বিষাদের ছাপ। প্রতিবেশীরাও এসে পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। নাহিলের দাদা-দাদি কেউই এখন বেঁচে নেই। গ্রামের বাড়িতে আছেন তাঁর এক চাচা-চাচি ও চার চাচাতো ভাই-বোন।নাহিলের চাচা ফরিদ মিয়া পুকড়া ইউনিয়ন পরিষদের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য। তিনি বলেন, তাঁর ভাই রাসেল মুঠোফোনে জানিয়েছেন, আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর নাহিলের মরদেহ ফ্রান্সেই দাফন করা হবে। তবে এখনো মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি।ফরিদ মিয়া বলেন, ‘ওই রাত থেকে আমরা শুধু নাহিলের খবরের অপেক্ষায় ছিলাম। বারবার মনে হচ্ছিল, হয়তো ওকে জীবিত উদ্ধার করা হবে। কিন্তু পরে যখন জানতে পারলাম, নাহিল আর বেঁচে নেই—তখন আর কিছু বলার মতো ছিল না।’

Source: https://www.prothomalo.com/bangladesh/district/op4n5lwfi5