প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা কেন প্রয়োজন?

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: October 21, 2026

সারকথাএই প্রবন্ধে সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা কেন প্রয়োজন, তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতির মেয়াদসীমা বিশ্বজুড়ে প্রচলিত হলেও ওয়েস্টমিনস্টারধর্মী ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী সাধারণত এমন সীমার আওতায় থাকেন না। কিন্তু দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে একজন প্রধানমন্ত্রী আইনসভা, বিচার বিভাগ, নির্বাচনব্যবস্থা, গণমাধ্যম ও প্রশাসনের ওপর প্রভাব বাড়িয়ে ক্ষমতাকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক করে তুলতে পারেন। হাঙ্গেরি, থাইল্যান্ড, বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া ও ভারতের অভিজ্ঞতা দেখায়, নিয়ন্ত্রণহীন দীর্ঘ শাসন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল করে, বিরোধী মত দমন করে এবং নির্বাচনী প্রতিযোগিতা সংকুচিত করে। থাইল্যান্ড আট বছরের সীমা কার্যকর করেছে; অন্য দেশগুলোতেও এ নিয়ে উদ্যোগ, বিতর্ক ও ঐকমত্য তৈরি হয়েছে। প্রবন্ধটির মূল যুক্তি হলো, নিয়মিত নেতৃত্ব পরিবর্তন জবাবদিহি, দলীয় গণতন্ত্র, শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর ও প্রাতিষ্ঠানিক অখণ্ডতা রক্ষায় সহায়ক। তবে ভোটারের পছন্দ সীমিত হওয়া, অভিজ্ঞ নেতৃত্ব হারানো এবং নীতির ধারাবাহিকতা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও বিবেচনা করা জরুরি। তাই সাংবিধানিক কাঠামো ও ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা নির্ধারণ করা যেতে পারে। এতে ক্ষমতার অপব্যবহার কমবে এবং গণতন্ত্র কর্তৃত্ববাদের দিকে ঝুঁকে পড়ার আশঙ্কাও হ্রাস পাবে।.ভূমিকারাষ্ট্রপতির মেয়াদসীমা—অর্থাৎ নির্বাহী প্রধানের পদে থাকার সময়কে পূর্বনির্ধারিত মেয়াদে সীমিত রাখার ব্যবস্থা—বিশ্বজুড়ে ব্যাপকভাবে প্রচলিত। ৯২টি দেশের ওপর মাল্টজের এক গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৯২ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে মাত্র পাঁচটি দেশ ছাড়া বাকি সব দেশেই নির্বাহী প্রধানের মেয়াদসীমা কার্যকর ছিল (মাল্টজ ২০০৭)। ডিকসন ও ল্যান্ডাউ উল্লেখ করেছেন, ‘বর্তমানে কার্যকর রাষ্ট্রপতিশাসিত ও আধা রাষ্ট্রপতিশাসিত সংবিধানগুলোর ৮০ শতাংশের বেশিতে রাষ্ট্রপতির মেয়াদসীমা রয়েছে’ (ডিক্সন ও ল্যান্ডউ ২০২০, ৩৫৯)। ফার্স্টিগ ও অন্যদের গবেষণাতেও অনুরূপ তথ্য উঠে এসেছে; তাঁদের মতে, বিশ্বের ৪৩ শতাংশ সংবিধানে নির্বাহী প্রধানের মেয়াদসীমা রয়েছে (ফার্স্টিগ ও অন্যান্য ২০২০)। ১৭৮৯ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত দীর্ঘতর সময়সীমা বিবেচনা করে গিন্সবার্গ, মেল্টন ও এলকিন্স সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে রাষ্ট্রপতিশাসিত ও আধা রাষ্ট্রপতিশাসিত সংবিধানগুলোর প্রায় ৬০ শতাংশে রাষ্ট্রপতির মেয়াদসীমা ছিল; ২০০৬ সালে কার্যকর সংবিধানগুলোর ক্ষেত্রে এই হার ৭৫ শতাংশের বেশি (গিন্সবার্গ ও অন্যান্য ২০১১)। তবে ওয়েস্টমিনস্টার ধাঁচের সংসদীয় ব্যবস্থায় একটি দেশ ছাড়া কোথাও প্রধান নির্বাহী—অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা নেই। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীদের ক্ষমতা সুসংহত করার ক্রমবর্ধমান প্রবণতার প্রেক্ষাপটে, তাঁদের মেয়াদসীমা নির্ধারণ নিয়ে বিতর্ক ও আলোচনা বেড়েছে।এই গবেষণা প্রবন্ধে পাঁচটি দেশের কেস স্টাডি—হাঙ্গেরি, থাইল্যান্ড, বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া ও ভারত—পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা নির্ধারণের পক্ষে যুক্তিগুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছে। হাঙ্গেরির সংসদ ২০২৬ সালের ১৫ জুন একটি সাংবিধানিক সংশোধনী অনুমোদন করে, যাতে প্রধানমন্ত্রী সর্বোচ্চ আট বছর দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। থাইল্যান্ডে ২০০৭ সালে সংবিধানের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা কার্যকর করা হয়। বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ায় পরপর একাধিক মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রীদের গণতান্ত্রিক রীতিনীতি ও প্রতিষ্ঠান ক্ষুণ্ন করে দেশকে স্বৈরতন্ত্রের দিকে ঠেলে দেওয়ার অভিজ্ঞতার প্রেক্ষাপটে এ ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ নিয়ে তীব্র বিতর্ক ও আলোচনা চলছে। স্বাধীনতা-উত্তর ভারতে দুবার প্রধানমন্ত্রীদের টানা দুই মেয়াদের বেশি ক্ষমতায় থাকতে দেখা গেছে; তাঁদের কর্তৃত্ববাদী পদক্ষেপ দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থায় স্থায়ী ছাপ ফেলেছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীও তৃতীয় মেয়াদে থাকায় ভারতের গণতন্ত্রের অবস্থা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ভ্যারাইটিজ অব ডেমোক্রেসি (ভি-ডেম) ইনস্টিটিউটের মতে, গত এক দশকে ভারত একটি ‘নির্বাচনী স্বৈরতন্ত্রে’ (electoral autocracy) পর্যবসিত হয়েছে (ভি-ডেম ইনস্টিটিউট ২০২৫, ১৬)।২০২৬ সালের মে মাসে পিটার মাগিয়ারের নেতৃত্বাধীন তিসা পার্টি অপ্রত্যাশিত বিপুল বিজয় অর্জন করে ভিক্টর অরবানের ১৬ বছরের শাসনের অবসান ঘটানোর পর হাঙ্গেরির সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাবটি আসে। ১৯৯০-এর দশকের পর একদলীয় স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা থেকে সফলভাবে উত্তরণের দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হাঙ্গেরি ২০১৮ সালের মধ্যে গণতান্ত্রিক পশ্চাদপসরণের একটি ‘দৃষ্টান্তমূলক ক্ষেত্রে’ পরিণত হয় (শেপেলে ২০১৮)। অরবানের দীর্ঘ শাসনকাল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দুর্বল হয়ে পড়া, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার অবনতি এবং নির্বাহী ক্ষমতার অতিমাত্রায় বৃদ্ধি দ্বারা চিহ্নিত।১৬ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের পর গণ–অভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করলে নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই সরকারটি ১১টি কমিশন নিয়োগ করে; এর একটি ছিল সংবিধান সংস্কার কমিশন। কমিশনটি ব্যাপক সংস্কারের সুপারিশ করে (দ্য ডেইলি স্টার ২০২৫), যার মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা নির্ধারণও ছিল। দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো—সাবেক ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তার প্রত্যক্ষ সহযোগী দলগুলো ছাড়া এ বিষয়ে একমত হয় যে ‘কোনো ব্যক্তি তাঁর জীবদ্দশায় ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না’ (আলমগীর ও আব্বাস ২০২৫)। ফলে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের উদ্যোগে ৩০টি রাজনৈতিক দলের সংলাপের মাধ্যমে প্রণীত ‘জুলাই জাতীয় সনদে’ বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হয় (জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ২০২৫)। ২০২৫ সালের অক্টোবরে ২৫টি রাজনৈতিক দল সনদটিতে স্বাক্ষর করে (দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২০২৫) এবং ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোটে এটি নাগরিকদের বিপুল সমর্থন পায় (বিএসএস ২০২৬)।২০০৭ সালের থাই সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর জন্য আট বছরের মেয়াদসীমা আরোপ করা হয়; ২০১৭ সালের সংবিধানেও তা বহাল থাকে। প্রধানমন্ত্রী প্রায়ুথ চান-ওচা ক্ষমতায় থাকতে পারবেন কি না, এ প্রশ্নে ২০২২ সালে দেশটির সাংবিধানিক আদালত তাঁর পক্ষে রায় দেন এবং মেয়াদসীমার বিধানটি পুনর্ব্যক্ত করে। মালয়েশিয়ায় ২০১৯ সাল থেকে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা আরোপের একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে (কৃষ্ণান ২০২৫)। ২০২৫ সালে প্রধানমন্ত্রী দাতুক সেরি আনোয়ার ইব্রাহিম ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেটিক অ্যাকশন পার্টির (ডিএপি) প্রস্তাব অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ দুই দফায় সীমিত রাখার পক্ষে সমর্থন জানান। তবে ২০২৬ সালের মার্চে প্রস্তাবটি সংসদের নিম্নকক্ষে অল্পের জন্য পাস হতে ব্যর্থ হয় (রয়টার্স ২০২৬)।ভারতে ২০২৪ সালে নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তৃতীয় মেয়াদ শুরু করার পর, জওহরলাল নেহরু ও ইন্দিরা গান্ধীর শাসনকালের অভিজ্ঞতার আলোকে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। আগেও এ ধরনের আলোচনা গুরুত্ব পেয়েছিল। ইসরায়েল, ইথিওপিয়া, নেপাল, ত্রিনিদাদ ও টোবাগো, জ্যামাইকাসহ আরও কয়েকটি দেশেও প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা ও প্রস্তাব বিবেচিত হয়েছে।এই প্রবন্ধ সাতটি অংশে বিভক্ত। দ্বিতীয় অংশে রয়েছে মেয়াদসীমার চর্চার উদ্ভব সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ঐতিহাসিক পর্যালোচনা তৃতীয় অংশে রাষ্ট্রপতির মেয়াদসীমা নিয়ে বিদ্যমান আলোচনাগুলো পর্যালোচনা করা হয়েছে এবং নির্বাহী প্রধানের ওপর মেয়াদসীমা আরোপের পক্ষে যুক্তিগুলো সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হয়েছে। চতুর্থ অংশে হাঙ্গেরি, থাইল্যান্ড, বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া ও ভারতের পাঁচটি কেস স্টাডি তুলে ধরা হয়েছে; পাশাপাশি যেসব দেশে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা নিয়ে আলোচনা হয়েছে, সেগুলোরও উল্লেখ রয়েছে। পর্যালোচিত পাঁচটি দেশের মধ্যে চারটিতে নেতাদের একাধিক মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা ক্ষমতার অপব্যবহার ও গণতান্ত্রিক চর্চা ক্ষুণ্ন করার সঙ্গে যুক্ত ছিল। অন্য দেশটিতে সংবিধান ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা নির্ধারণ করেছে। পঞ্চম অংশে দেখানো হয়েছে, রাষ্ট্রপতির মেয়াদসীমার পক্ষে প্রচলিত যুক্তিগুলো কীভাবে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। উপসংহারে প্রবন্ধটির প্রধান বক্তব্যগুলো তুলে ধরা হয়েছে।মেয়াদসীমার দীর্ঘ ইতিহাসবিংশ শতাব্দীতে মেয়াদসীমা একদিকে একাডেমিক সাহিত্যে তীব্র আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে, অন্যদিকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সুসংবদ্ধ রূপ লাভ করে, কিন্তু ধারণা ও চর্চা হিসেবে এর ইতিহাস অনেক পুরোনো। বহু গবেষক গ্রিক-পূর্ব সমাজে, বিশেষত মেসোপটেমিয়া (জ্যাকবসন ১৯৪৩) ও ইসরায়েলের (গটওয়াল্ড ১৯৯৯) মতো প্রাচীন সভ্যতায় নেতৃত্বের অনানুষ্ঠানিক সীমার নজির খুঁজে পেয়েছেন। এথেন্সে পর্যায়ক্রমিক আবর্তনের অংশ হিসেবে মেয়াদসীমা প্রশাসনিক কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত ছিল (হেডলাম ১৮৯১; স্টোন ২০১৯; বিট্রোস ২০২২)। প্রাচীন রোমে এর আরেক রূপ দেখা যায়। প্রধান ম্যাজিস্ট্রেট কনসালরা এক বছরের জন্য নির্বাচিত হতেন এবং অবিলম্বে পুনর্নির্বাচিত হতে পারতেন না; এর ফলে নিয়মিত নেতৃত্ব পরিবর্তন ও অংশীদারত্বমূলক শাসন নিশ্চিত হতো (বিয়ার্ড ২০১৫)। এই নীতি ‘কার্সাস অনোরাম’-এর অন্তর্গত অন্যান্য ম্যাজিস্ট্রেট পদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য ছিল। ‘লেক্স ভিলিয়া অ্যানালিস’-এর মতো আইন কর্মকর্তাদের ন্যূনতম বয়স এবং এক পদ থেকে অন্য পদে যাওয়ার মধ্যবর্তী সময় নির্ধারণ করেছিল (কোয়জর ১৯৮৪)।রোমান প্রজাতন্ত্রের পতনের পর কেন্দ্রীভূত কর্তৃত্বসম্পন্ন সাম্রাজ্যিক কাঠামোর উত্থান নেতৃত্বের পর্যায়ক্রমিক আবর্তন ও মেয়াদসীমার প্রথাকে বিস্মৃতির আড়ালে ঠেলে দেয়। রেনেসাঁ যুগে ইতালির উত্তরাঞ্চলীয় নগররাষ্ট্র—যেমন ভেনিস ও ফ্লোরেন্সে—এই চর্চা আবারও দেখা দেয় (ভিরোলি ২০০২)। অষ্টাদশ শতাব্দীর দুটি দলিল এ বিষয়ে সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থান তুলে ধরে। আমেরিকার প্রথম শাসনতান্ত্রিক রূপরেখা ‘আর্টিকেলস অব কনফেডারেশন’ (১৭৭৭) ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সীমিত সরকারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিল এবং ক্ষমতা স্থায়ীভাবে কুক্ষিগত হওয়া ঠেকাতে পদে পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তনের উপযোগিতার ওপর জোর দিয়েছিল (ফেভরাত ও কুসার ২০২৫)। অন্যদিকে মার্কিন সংবিধান (১৭৮৭) নির্বাহী পদের মেয়াদ সীমিত করার বিষয়ে নীরব ছিল। তবে সংবিধান প্রণেতাদের মধ্যে—বিশেষ করে টমাস জেফারসন ও জেমস ম্যাডিসনের মধ্যে—এ নিয়ে বিতর্ক হয়েছিল। ক্ষমতায় ধারাবাহিকতার সুফল এবং অনির্দিষ্টকাল পদে থাকার বিপদ ছিল সেই বিতর্কের মূল বিষয়। ঊনবিংশ শতাব্দীতে লাতিন আমেরিকার কয়েকটি দেশ কঠোর মেয়াদসীমা নিয়ে সাংবিধানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালায় (বাতুরু ২০১৪)।এই দীর্ঘ ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার সত্ত্বেও, ১৯৫১ সালে মার্কিন সংবিধানের ২২তম সংশোধনী গৃহীত হওয়ার মধ্য দিয়ে বিংশ শতাব্দীতে মেয়াদসীমা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। দুই মেয়াদের আনুষ্ঠানিক সীমা আরোপের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল আরেকজন ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্টের আবির্ভাব ঠেকানো; তিনি প্রচলিত রীতি ভেঙে মৃত্যুর আগে চারবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন (১৯৩৩–১৯৪৫) (বুচার ২০২৩)। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায় উপনিবেশমুক্তির ফলে বহু নতুন স্বাধীন দেশের জন্ম হয়। নির্বাহী নেতৃত্বের নিয়মিত পরিবর্তন উৎসাহিত করতে এদের অনেকেই নতুন সংবিধানে মেয়াদসীমা অন্তর্ভুক্ত করে। গণতন্ত্রের তৃতীয় ঢেউয়ে, বিশেষ করে ১৯৯০-এর দশকে, মেয়াদসীমা ব্যাপক ও ‘প্রায় সর্বজনীন’ হয়ে ওঠে (ফার্স্টিগ ও অন্যান্য ২০২০)। ২০০১ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে আফ্রিকার ২০টি দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের সাংবিধানিক কাঠামোতে নির্বাহী প্রধানের মেয়াদসীমা যুক্ত করে; এটি প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্ব পরিবর্তন ও গণতান্ত্রিক সুসংহতকরণের দিকে মহাদেশীয় পরিবর্তনের প্রতিফলন (মারে ও অন্যান্য ২০১৯)।মেয়াদসীমা কেন প্রয়োজননির্বাহী প্রধানের মেয়াদসীমা নিয়ে গবেষণা করেছেন এবং এই ব্যবস্থাকে সমর্থন করেছেন, এমন গবেষকেরা এর পক্ষে কয়েকটি পরস্পরসম্পর্কিত যুক্তি দিয়েছেন। প্রথমত, মেয়াদসীমা কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করে এবং স্বৈরতান্ত্রিক শাসন সুসংহত হওয়া ঠেকায়। তাঁদের মতে, সংবিধানে মেয়াদসীমা স্থির করে দিলে লাগামহীন ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার সুযোগ সংকুচিত হয়। অনির্দিষ্টকাল ক্ষমতায় থাকার সুযোগ নির্বাহী প্রধানকে রাজনৈতিক বিরোধীদের দমনে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার এবং নিজের কর্তৃত্ব স্থায়ী করতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রভাবিত করার অবকাশ দেয়; এতে গণতান্ত্রিক রীতিনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয় (হান্টিংটন ১৯৯১)। সভোলিক (২০১৯) এবং গিন্সবার্গ, মেল্টন ও এলকিন্সের (২০২১) গবেষণা দেখায়, নির্বাহী প্রধানের মেয়াদসীমা সাংবিধানিক নিয়ন্ত্রণ হিসেবে কাজ করে এবং এমন ক্ষমতাসীনদের বেঁধে রাখে, যাঁরা ক্ষমতা ধরে রাখতে অন্যথায় প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা দুর্বল করতেন। মেয়াদসীমা একদলীয় আধিপত্যের ঝুঁকি কমায়, দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র উৎসাহিত করে এবং নির্বাচনকে প্রতিযোগিতামূলক রাখতে সহায়তা করে। ফলে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বাড়ে এবং কোনো নেতা অতিরিক্ত দীর্ঘ সময় রাজনৈতিক পরিসরে আধিপত্য বিস্তার করতে পারেন না (গান্ধী ও লাস্ট-ওকার ২০২১; গ্রিন ২০২২)।এই প্রসঙ্গে ডিকসন ও ল্যান্ডাউ যুক্তি দেন:‘একজন ব্যক্তি কত দিন রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন, তা সীমিত করলে জনগণের মনে প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাষ্ট্রপতির পদ এবং সেই পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তির মধ্যকার প্রয়োজনীয় পার্থক্য বজায় থাকে। এতে কেবল ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা বা আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের জোরে কোনো রাষ্ট্রপতির তাঁর আনুষ্ঠানিক আইনি ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করার ঝুঁকি কমে।’ (ডিকসন ও ল্যান্ডাউ ২০২৪)যুক্তি দেওয়া হয় যে মেয়াদসীমা ক্ষমতাসীনদের শাসনকাল বাড়াতে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় কারসাজি করা থেকে বিরত রেখে নির্বাচনী প্রতিযোগিতা বাড়ায়। এটি অসাংবিধানিকভাবে মেয়াদ বাড়ানোর সঙ্গে যুক্ত রাজনৈতিক সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতা কমাতে সহায়তা করে (লিন্ডবার্গ ২০২৩; চিজম্যান ২০২১)। মাঙ্গালার (২০২০) মতে, অনির্দিষ্টকাল পুনর্নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ না থাকলে ক্ষমতাসীনেরা ক্ষমতা কুক্ষিগত করা বা পদে টিকে থাকতে নির্বাচনী ব্যবস্থায় কারসাজি করার দিকে কম ঝোঁকেন। এতে নির্বাচনী জালিয়াতির ঝুঁকি কমে এবং রাষ্ট্রপতিশাসিত বা সংসদীয় ব্যবস্থায় পারিবারিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা প্রতিরোধ করা যায়।সংশ্লিষ্ট আরেকটি যুক্তিতে গবেষকেরা বলেছেন, জনগণের আস্থা গড়ে তুলতে নিয়মিত নেতৃত্ব পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে; এই আস্থা গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মৌলিক ভিত্তি। নাগরিকেরা নির্দিষ্ট বিরতিতে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর দেখলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি তাঁদের আস্থা বাড়ে (ডায়মন্ড ২০০৮)। নির্বাহী প্রধানের মেয়াদ সীমিত করা গণতান্ত্রিক জবাবদিহিও জোরদার করে। ডায়মন্ডের (২০০৮) মতে, নিয়মিত নেতৃত্ব পরিবর্তন নিশ্চিত করে মেয়াদসীমা পর্যায়ক্রমিক ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের নীতি সমুন্নত রাখে, জনগণের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে এবং গণতান্ত্রিক অবক্ষয় প্রতিরোধ করে। ‘নিরঙ্কুশ ক্ষমতা নিরঙ্কুশভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত করে’—এই বহুল প্রচলিত কথার প্রতিফলন এমন প্রমাণে দেখা যায় যে সীমিত মেয়াদ নেতাদের প্রাতিষ্ঠানিক সীমার মধ্যে কাজ করতে এবং ব্যক্তিগত ক্ষমতাবৃদ্ধির বদলে দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে উৎসাহিত করে।নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রভাবের দিক থেকে মেয়াদসীমা রাজনৈতিক পরিসরে নতুন ধারণার প্রবেশ ঘটায়। ক্লেসনার (২০১৯) যুক্তি দেন, নির্বাহী প্রধানের মেয়াদের সংখ্যা সীমিত করলে নেতৃত্ব পরিবর্তনের সুযোগ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় এবং রাজনৈতিক স্থবিরতা কাটতে পারে। এই পরিবর্তন শুধু শাসনব্যবস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করে না, পরিবর্তনশীল সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জে রাষ্ট্রের সাড়া দেওয়ার সক্ষমতাও বাড়ায়। গবেষকদের মতে, মেয়াদ–সীমাবদ্ধ নেতারা নিজেদের রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে অর্থবহ সংস্কারে বেশি আগ্রহী হন। ফলে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা নির্বাহী প্রধানের ব্যক্তিগত কর্মসূচির কাছে জাতীয় অগ্রাধিকার জিম্মি হয় না; নতুন প্রশাসন ব্যক্তিগত উত্তরাধিকারের বদলে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নে নতুন করে মনোযোগ দেয় (ফাইনার ২০০৭; ফ্রান্টজ ও অন্যান্য ২০২২)। গবেষণায় দীর্ঘমেয়াদি ক্ষমতাসীনতার অর্থনৈতিক মূল্যও দেখা গেছে: এটি বর্ধিত দুর্নীতির সঙ্গে সম্পর্কিত। নির্বাহী পদে সময়সীমা আরোপ করলে দুর্নীতিমূলক চর্চা কমে এবং প্রাতিষ্ঠানিক অখণ্ডতা বজায় থাকার সম্ভাবনা বাড়ে (রাফ্টোপোলোস ২০১৩)।নির্বাহী প্রধানের মেয়াদসীমা সাধারণত দুই ধরনের: ধারাবাহিক মেয়াদসীমা (consecutive term limits) এবং চূড়ান্ত বা পূর্ণ মেয়াদসীমা (absolute term limits); শাসনব্যবস্থায় এ দুটির ভূমিকা ভিন্ন। ধারাবাহিক মেয়াদসীমার অধীনে একজন পদাধিকারী নির্দিষ্ট সংখ্যক টানা মেয়াদ দায়িত্ব পালন করতে পারেন এবং বাধ্যতামূলক বিরতির পর আবার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন। অন্যদিকে চূড়ান্ত মেয়াদসীমা নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার পর একই পদে ফিরে আসা স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করে। উভয় ব্যবস্থাই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কার্যকর রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ মার্কিন সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেয়; মেয়াদ দুটি টানা বা বিরতিসহ হতে পারে। অল্প কয়েকটি দেশে রাষ্ট্রপতি মাত্র এক মেয়াদ দায়িত্ব পালন করতে পারেন; তবে অধিকাংশ সংবিধানে রাষ্ট্রপতির জন্য দুই মেয়াদের সীমা নির্ধারিত (ফাইনার ২০০৭; গিন্সবার্গ ও মেল্টন ২০১৫)।যদিও বহু দেশ রাষ্ট্রপতির মেয়াদসীমা গ্রহণ করেছে এবং উল্লেখযোগ্যসংখ্যক গবেষক এই ব্যবস্থার পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন, অন্যরা এর কিছু অসুবিধার কথাও উল্লেখ করেছেন। তাঁদের যুক্তি মূলত তিনটি। প্রথমত, মেয়াদসীমা জনগণের পছন্দের অধিকার এবং পরোক্ষভাবে, জনপ্রিয় সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন করে (ফাইনার ২০০৭; গিন্সবার্গ ও মেল্টন ২০১৫; বাতুরো ও এলগি ২০২৪)। দ্বিতীয়ত, বিশেষ করে শক্তিশালী দলীয় প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ নেই—এমন ব্যবস্থায় এটি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, অভিজাতদের বিভাজন, দলের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও উপদলীয় সংঘাত সৃষ্টি করতে পারে (পাউডেল ২০২২)। তৃতীয়ত, শাসন, কূটনীতি এবং নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে মূল্যবান দক্ষতা অর্জনকারী অভিজ্ঞ নেতাদের হারানোর ঝুঁকি থাকে । স্টোকস (২০০১), গিন্সবার্গ ও অন্যান্য (২০১২) এবং স্মিটস (২০২৫) পর্যবেক্ষণ করেছেন যে দুর্বল আমলাতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানবিশিষ্ট রাষ্ট্রে সীমিত মেয়াদের সরকার বিস্তৃত নীতিগত কর্মসূচি অব্যাহত রাখতে ব্যর্থ হতে পারে।কেস স্টাডিহাঙ্গেরি: প্রস্তাবিত মেয়াদসীমা২০২৬ সালের ১৫ জুন হাঙ্গেরির সংসদ একটি সাংবিধানিক সংশোধনী অনুমোদন করে, যাতে প্রধানমন্ত্রীর সর্বোচ্চ মেয়াদ আট বছর নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়। এর মধ্য দিয়ে হাঙ্গেরি প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা বিবেচনাকারী প্রথম ইউরোপীয় দেশ হয়ে ওঠে। ২০২৬ সালের মে মাসে পিটার মাগিয়ারের নেতৃত্বাধীন তিসা পার্টি ফিদেস পার্টির বিরুদ্ধে অপ্রত্যাশিত বিপুল বিজয় অর্জন করে ভিক্টর অরবানের ১৬ বছরের শাসনের অবসান ঘটানোর পর এই উদ্যোগ নেওয়া হয়। অরবানের প্রথম প্রধানমন্ত্রিত্বকাল ছিল ১৯৯৮ থেকে ২০০২ সাল; সে সময় তিনি একটি রক্ষণশীল জোট সরকারের নেতৃত্ব দেন। ২০১০ সালে পুনর্নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি টানা চার মেয়াদ দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২২ সালের প্রতিটি নির্বাচনে তাঁর দল সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।১৯৮০-এর দশকের শেষভাগ পর্যন্ত হাঙ্গেরি একদলীয় কমিউনিস্ট শাসনের অধীনে ছিল। পূর্ব ইউরোপে কমিউনিস্ট শাসনের অবসানের পর দেশটি ১৯৯০ সালে প্রথম বহুদলীয় নির্বাচন আয়োজন করে। ১৯৯০ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে রাজনৈতিক পরিসরে বামপন্থী দলগুলোর প্রাধান্য ছিল এবং হাঙ্গেরীয় সমাজতান্ত্রিক দল (এমএসজেডপি) ও হাঙ্গেরীয় লিবারেল পার্টির জোট বিরতিসহ মোট ১২ বছর দেশ শাসন করে। এই সময়ে ভিক্টর অরবানসহ নয়জন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করেন। কেউই এক মেয়াদের বেশি ক্ষমতায় থাকেননি; কয়েকজন চার বছরের মেয়াদও পূর্ণ করতে পারেননি। ভিক্টর অরবান ১৯৮৮ সালে ফিদেস পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন; দলটি তখন বামঘেঁষা ছিল। ১৯৯৮ সালে তিনি জোট সরকারের অংশীদার হন এবং প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।অবাধ নির্বাচন, স্বাধীন বিচার বিভাগ ও গণমাধ্যম এবং নির্বাহী ও আইনসভার মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যের মতো গণতান্ত্রিক সূচকগুলো হাঙ্গেরির সফল উত্তরণ নিশ্চিত করেছিল; দেশটিকে ‘সুসংহত গণতন্ত্র’ হিসেবেও বর্ণনা করা হয়েছিল (ভাচুদোভা ২০১০)। তবে ২০১০ সালে অরবান ক্ষমতায় ফেরার পর গণতন্ত্রের গুরুতর অবনতি শুরু হয়। ফিদেস ধাপে ধাপে সাংবিধানিক আদালতকে অকার্যকর করে, নির্বাচন কমিশনের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে, সংবিধান সংশোধনের সীমা শিথিল করে এবং নতুন সংবিধান প্রণয়ন করে। একই সঙ্গে দলটি গণমাধ্যমের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা, সুশীল সমাজের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ এবং এমন অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করে, যা একটি লুটপাটতান্ত্রিক ব্যবস্থা সৃষ্টি করে। প্রধান গণতন্ত্র সূচকগুলোতে এসব পরিবর্তনের ফলে দেশটি ‘দো–আঁশলা শাসনব্যবস্থা’ (hybrid regime) ও ‘নির্বাচনী স্বৈরতন্ত্র’ হিসেবে চিহ্নিত হয়। এই নাটকীয় পশ্চাদ্‌পসারণ হাঙ্গেরিকে প্রধানমন্ত্রীর হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার একটি প্রতীকী দৃষ্টান্তে পরিণত করে।থাইল্যান্ড: আরোপিত মেয়াদসীমাঘন ঘন সামরিক অভ্যুত্থান ও নতুন সংবিধান প্রণয়নের জন্য থাইল্যান্ড পরিচিত। দেশটিতে ১৮টি অভ্যুত্থানের চেষ্টা হয়েছে, যার ১৩টি সফল (থাই ইনকুইরার ২০২০)। ১৯৩২ সালের অভ্যুত্থানের পর দেশটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্রে পরিণত হয়; এরপর ২০টি সংবিধান ও সনদ প্রণীত হয়েছে। ২০টি বা তার বেশি সংবিধান থাকা ‘নির্বাচিত কয়েকটি দেশের’ একটি হিসেবে থাইল্যান্ডকে উল্লেখ করা হয় (দ্য নেশন ২০২২)। গত ৯৩ বছরে দেশটিতে ৩১ জন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করেছেন, যাঁদের ১৬ জন ছিলেন সামরিক নেতা। দীর্ঘতম মেয়াদে থাকা প্রধানমন্ত্রী বিরতিসহ প্রায় ১৫ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। একাধিক মেয়াদে দায়িত্ব পালনকারীদের অধিকাংশই সামরিক নেতা। অনেক প্রধানমন্ত্রীর শাসন কর্তৃত্ববাদী হলেও এর প্রধান কারণ ছিল তাঁদের সামরিক পটভূমি এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলন দমনে কঠোর পন্থা গ্রহণ। কয়েকজন প্রধানমন্ত্রী পূর্ণ মেয়াদ সম্পন্ন করেছেন; তবে থাকসিন সিনাওয়াত্রা (২০০১–২০০৬) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কারণ, তিনিই প্রথম নির্বাচিত সরকারকে পূর্ণ মেয়াদ নেতৃত্ব দেন। ফলে থাইল্যান্ডে প্রধানমন্ত্রীর হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়া এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বহু দেশের মতো দীর্ঘ টানা মেয়াদের ফল ছিল না।থাইল্যান্ডের রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর প্রভাবশালী ভূমিকা এবং গণতান্ত্রিক উত্তরণে তাদের পুনঃপুন হস্তক্ষেপের কারণে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা সীমিত করার প্রশ্নটি দীর্ঘদিন জনপরিসর বা সংবিধান বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় গুরুত্ব পায়নি; বরং বিভিন্ন সংবিধানে সামরিক বাহিনীকে ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে; ২০০৬ সালের অন্তর্বর্তী সংবিধান এর একটি উদাহরণ। ২০০৭ সালে নতুন সংবিধান ওই অন্তর্বর্তী সংবিধানকে প্রতিস্থাপন করে এবং দেশটির ইতিহাসে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা নির্ধারণ করে। সংবিধানের ১৭১ অনুচ্ছেদে বলা হয়, ‘প্রধানমন্ত্রী টানা আট বছরের বেশি সময় পদে অধিষ্ঠিত থাকতে পারবেন না’ (কনস্টিটিউট ২০২৫)। ২০১৭ সালের সংবিধানের ১৫৮ ধারায়ও বিধানটি বহাল রাখা হয়।এক বিশ্লেষকের মতে, ‘এই মেয়াদসীমার উদ্দেশ্য নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্র প্রতিরোধ করা নয়; বরং থাইল্যান্ডের অস্থিতিশীল রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে থাকা রক্ষণশীল ক্ষমতাকাঠামোর প্রতিপক্ষদের বাধা দেওয়া’ (তনসাকুলরুংরুয়াং ২০২৩, ১৫৩)। তা সত্ত্বেও, এই সাংবিধানিক বিধানের কারণে থাইল্যান্ডই একমাত্র দেশ, যেখানে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা কার্যকর রয়েছে।বাংলাদেশ: মেয়াদসীমা নির্ধারণে সম্মতি১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের অস্থির ইতিহাসে সংসদীয় ও রাষ্ট্রপতিশাসিত—উভয় ধরনের সরকারই ছিল। দেশটির ৫৩ বছরের ইতিহাসে ১৫ বছরের বেশি সময় সামরিক শাসন চলেছে। সংসদীয় ব্যবস্থা তিন পর্বে কার্যকর ছিল: ১৯৭২ সালের জানুয়ারি থেকে ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি; ১৯৯১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০০৭ সালের জানুয়ারি; এবং ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত। ১৯৭২ সালের সংবিধান ওয়েস্টমিনস্টার ধাঁচের গণতন্ত্রের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, যেখানে প্রধানমন্ত্রী প্রধান নির্বাহী এবং সংসদে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি আনুষ্ঠানিক প্রধান। প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা বাহ্যত অন্যান্য ওয়েস্টমিনস্টার ব্যবস্থার মতো হলেও বিভিন্ন বিধান—বিশেষত প্রধানমন্ত্রীকে অপসারণের কোনো ব্যবস্থা না থাকা—নিয়ে সমালোচনা ছিল (আহমেদ ১৯৮৩)। আরেকটি সমালোচনা ছিল দলত্যাগবিরোধী ৭০ অনুচ্ছেদ, যা সংসদ সদস্যদের নিজ দলের বিরোধিতা করার ক্ষমতা সীমিত করেছিল।১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে সংবিধান সংশোধন করে একদলীয় রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়। এতে ওয়েস্টমিনস্টার ধাঁচের সংসদীয় ব্যবস্থার অবসান ঘটে এবং ১৯৭৩ সাল থেকে দৃশ্যমান কর্তৃত্ববাদী শাসন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। সংশোধনীতে রাষ্ট্রপতির পদটি সরাসরি নির্বাচিত হওয়ার কথা থাকলেও সংসদ শেখ মুজিবুর রহমানকে নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে ‘নির্বাচিত’ করে। প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতির অধীন হয়ে পড়েন; রাষ্ট্রপতি এমনকি সংসদ সদস্য নন—এমন ব্যক্তিকেও প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের ক্ষমতা পান। একই সঙ্গে ৭০ অনুচ্ছেদ আরও কঠোর করা হয়।১৯৭৫ সালের আগস্টে এক নৃশংস সামরিক অভ্যুত্থানে মুজিব নিহত হন; তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্য ও ঘনিষ্ঠ সহযোগীকেও হত্যা করা হয়। একদলীয় ব্যবস্থা বাতিল হলেও সামরিক শাসকেরা রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা বহাল রাখেন। সামরিক শাসক জেনারেল জিয়াউর রহমান ১৯৭৫ থেকে ১৯৮১ সালের মে মাসে এক ব্যর্থ অভ্যুত্থানে নিহত হওয়া পর্যন্ত এবং হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ১৯৮২ সালের মার্চ থেকে ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে গণ–অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া পর্যন্ত সংবিধানের পঞ্চম ও সপ্তম সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা বজায় রাখেন। সামরিক শাসনকে বেসামরিক রূপ দিতে কয়েকটি সংসদীয় নির্বাচন (১৯৭৯, ১৯৮৬ ও ১৯৮৮) অনুষ্ঠিত হয় এবং রাষ্ট্রপতিরা নির্বাচনের মাধ্যমে (১৯৭৭ ও ১৯৮৬) সাংবিধানিক বৈধতা অর্জন করেন। সংসদের ক্ষমতা ছিল সামান্য; প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ছিল প্রায় অস্তিত্বহীন।১৯৯০ সালে গণ–অভ্যুত্থানে এইচ এম এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালে নবনির্বাচিত সংসদ সংবিধান সংশোধন করে সংসদীয় ব্যবস্থা পুনর্বহাল করে। দ্বাদশ সংশোধনীতে প্রধানমন্ত্রীকে প্রধান নির্বাহী এবং রাষ্ট্রপতিকে আনুষ্ঠানিক প্রধান করা হয়, যদিও সব নির্বাহী কার্যক্রম রাষ্ট্রপতির নামে পরিচালিত হবে (অনুচ্ছেদ ৫৫)। এসব পরিবর্তন প্রধানমন্ত্রীকে কার্যত সীমাহীন ক্ষমতা দেয়। রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা নির্ধারণকারী ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া সব কাজে রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী চলতে হয়। এর অর্থ, নির্বাচন কমিশনের মতো ‘স্বাধীন’ প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রেও তাঁকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ নিতে হয়। আরও বলা হয়, এই পরামর্শে রাষ্ট্রপতির গৃহীত পদক্ষেপ বিচারিক পর্যালোচনার আওতায় পড়বে না। দলত্যাগবিরোধী ৭০ অনুচ্ছেদের পরিবর্তনও বিধানটিকে কঠোর করে ক্ষমতাসীন দল ও প্রধানমন্ত্রীকে—যিনি একই সঙ্গে সংসদ নেতা ও দলীয় প্রধান—সুরক্ষা দেয়।দেশটি বাহ্যত ওয়েস্টমিনস্টার ধাঁচের সংসদীয় ব্যবস্থা অনুসরণ করলেও ক্ষমতা নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রধানমন্ত্রী প্রয়োগ করতেন। ১৯৯১ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মধ্যে পালাক্রমে ক্ষমতাবদলের ফলে কার্যত দ্বিদলীয় ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। কিন্তু দুই দলের ক্রমবর্ধমান তিক্ত সম্পর্ক সংসদকে অকার্যকর করে তোলে। ক্ষমতায় যে দলই থাকুক, বিরোধীদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে চাইত না; বিরোধীরা দীর্ঘ ও পুনঃপুন সংসদ বর্জনের মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানাত। ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়। ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত এই ব্যবস্থায় নির্বাচিত সরকারের মেয়াদ শেষে নির্বাচন পরিচালনার জন্য ৯০ দিনের নির্দলীয় অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের বিধান ছিল। ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচন এই ব্যবস্থায় অনুষ্ঠিত হয় এবং যথাক্রমে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি জয়ী হয়। কিন্তু ২০০৬ সালের শেষ দিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান কে হবেন, এ নিয়ে অচলাবস্থা সৃষ্টি হলে সামরিক বাহিনী একটি ‘নরম অভ্যুত্থান’ ঘটায়। পরবর্তী দুই বছর সামরিক-সমর্থিত বেসামরিক সরকার দেশ শাসন করে।২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় এবং শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল, সংবিধানের এক-তৃতীয়াংশের বেশি অংশ অসংশোধনীয় এবং সংবিধানের সমালোচনাও দণ্ডনীয় করা হয় (অনুচ্ছেদ ৭ক ও ৭খ)। কেবল আওয়ামী লীগ সদস্যদের নিয়ে গঠিত সংসদীয় কমিটি তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বহাল রাখার সুপারিশ করলেও হাসিনা একক সিদ্ধান্তে তা বাতিল করেন। পরবর্তী বছরগুলোতে নাগরিক অধিকার দমনে কঠোর আইন প্রণীত হয়; সুশীল সমাজকে দুর্বল করা হয়; বিরোধীদের নিপীড়ন, বিচার বিভাগকে আপসকামী এবং গণমাধ্যমকে নীরব বা অনুগত করা হয়; বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহৃত হয় এবং প্রধানমন্ত্রী হাসিনা ও তাঁর পিতা শেখ মুজিবকে দেবতুল্য করে তোলা হয় (রীয়াজ ২০২২)। রাষ্ট্র ও দলের সব শাখার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণসহ সর্বক্ষমতাবান প্রধানমন্ত্রীর উদ্ভব ঘটে। তিনটি সাজানো নির্বাচন (২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪) অনুষ্ঠিত হয়; এর মধ্যে দুটি সব বিরোধী দল বর্জন করে। ১৯৯৬–২০০১ সালের পূর্ববর্তী মেয়াদ ছাড়াও হাসিনা টানা চার মেয়াদ প্রধানমন্ত্রী হন। এসব কারণে বহু আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিশ্লেষক বাংলাদেশকে ‘কর্তৃত্ববাদী’, ‘মধ্যম স্বৈরতন্ত্র’ ও ‘প্রতিযোগিতামূলক কর্তৃত্ববাদী’ হিসেবে বর্ণনা করেন (সাভোইয়া ও আসাদুল্লাহ ২০১৯; ব্লেয়ার ২০২০; হোসেন ২০২০; বিটিআই ২০২২; মোস্তফা ও সুবেদি ২০২১)। হাসিনাকে ‘এশিয়ার লৌহমানবী’ও বলা হয় (কর্নার ২০২৩)।ক্ষমতার ভারসাম্য ও পারস্পরিক নিয়ন্ত্রণের অনুপস্থিতি, প্রধানমন্ত্রীর লাগামহীন নির্বাহী ক্ষমতা এবং মেয়াদসীমা না থাকা—এই তিন বিষয় ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে শেখ হাসিনার অধীনে বাংলাদেশকে নির্বাচনী গণতন্ত্র থেকে স্বৈরতন্ত্রে রূপান্তরে সহায়তা করেছে। কেউ কেউ বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা প্রয়োজন কি না, প্রশ্ন তুললেও (কুদরাত-ই-ইলাহী ২০২৪), এর পক্ষে ব্যাপক জনদাবি ছিল (দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২০২৪); ফলে রাজনৈতিক দলগুলো সীমা আরোপে একমত হয়। গণভোটে নাগরিকদের বিপুল সমর্থনও প্রতিফলিত হয়েছে। তবে ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ অনুযায়ী সংবিধান সংশোধিত হলেই বিধানটি কার্যকর হবে।মালয়েশিয়া: মেয়াদসীমা আরোপের একাধিক প্রচেষ্টাস্বাধীনতার পর ৬১ বছর মালয়েশিয়া বারিসান ন্যাশনালের (বিএন বা ন্যাশনাল ফ্রন্ট) শাসনে ছিল। ১৯৫৭ থেকে ২০০৩ সালের মধ্যে ছয়জন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করেন। তাঁদের মধ্যে দুজন দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় ছিলেন—টুঙ্কু আবদুল রহমান ১৯৫৭ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ১৩ বছর এবং মাহাথির মোহাম্মদ ১৯৮১ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত ২২ বছর। তাঁদের পর দীর্ঘতম সময় ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক; তিনি ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত প্রায় ১০ বছর দায়িত্ব পালন করেন।১৯৫৫ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে মালয়ের মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত টুঙ্কু আবদুল রহমান স্বাধীনতার পর দেশটির প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন। স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনায় নেতৃত্ব দেওয়ায় তাঁকে মালয়েশিয়ার ‘প্রতিষ্ঠাতা পিতা’ মনে করা হয়। তাঁর মেয়াদে দেশটি অস্থির সময় অতিক্রম করে। তিনি মালয়েশিয়া ফেডারেশন গঠন ও ভাঙনের সময় নেতৃত্ব দেন; তাঁর আমলেই ১৯৬৯ সালে চীনা ও মালয়দের মধ্যে জাতিগত দাঙ্গা ঘটে। দাঙ্গার পর জরুরি অবস্থা ও সংসদ স্থগিতের ফলে গণতান্ত্রিক চর্চা বন্ধ হয়ে যায়। জরুরি অবস্থা ঘোষণার পর তাঁর উপপ্রধানমন্ত্রী তুন আবদুল রাজাক কার্যত প্রধানমন্ত্রী হয়ে ওঠেন; টুঙ্কুকে অসম্মানজনকভাবে বিদায় নিতে হয় এবং ১৯৭০ সালে পদত্যাগ করা ছাড়া তাঁর সামান্যই বিকল্প ছিল।মাহাথির মোহাম্মদ তাঁর দল ইউনাইটেড মালয়স ন্যাশনাল অর্গানাইজেশনের (উমনো) বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করে ধীরে ধীরে ক্ষমতার শীর্ষে ওঠেন এবং বারিসান ন্যাশনাল জোটের নেতৃত্বে ১৯৮১ সালে দেশের চতুর্থ প্রধানমন্ত্রী হন। প্রথম মেয়াদে তিনি রাজতন্ত্রের সাংবিধানিক ক্ষমতা খর্ব করেন; রাজপরিবারের বিচারিক দায়মুক্তি বাতিলও এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। এতে নির্বাচিত সরকারের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হলেও নির্বাহী বিভাগের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার বিষয়টিও স্পষ্ট হয়। পরবর্তী বছরগুলোতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংকুচিত করা, বিরোধী কর্মীদের নিপীড়ন এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হ্রাসের মধ্য দিয়ে তাঁর শাসন কর্তৃত্ববাদের দিকে এগোয়। তৃতীয় মেয়াদে তিনি সব ধরনের ভিন্নমতের বিরুদ্ধে দমন আরও তীব্র করেন। ১৯৮৭ সালে তিনটি সংবাদপত্র বন্ধ করা হয় এবং শতাধিক রাজনীতিবিদ, বিরোধী নেতা, সামাজিক আন্দোলনকর্মী, পরিবেশবাদী ও শিক্ষাবিদকে আটক করা হয়। এরপর সমাবেশ, বাক্‌স্বাধীনতা ও বিচারিক কর্তৃত্বসংক্রান্ত সাংবিধানিক অধিকার সীমিত করে আরও আইন প্রণীত হয়। এতে মাহাথিরের দুই পূর্বসূরি টুঙ্কু আবদুল রহমান ও হুসেইন ওন প্রতিবাদ করে বলেন, সংসদীয় গণতন্ত্রকে নস্যাৎ করা হয়েছে (তান ১৯৯০)।১৯৮৮ সাল মালয়েশিয়ার ইতিহাসে কলঙ্কজনক হয়ে আছে। ওই বছর সংবিধানের ১২১ অনুচ্ছেদ সংশোধন এবং প্রধান বিচারপতিসহ ছয় বিচারপতিকে অপসারণের মাধ্যমে নির্বাহী বিভাগ বিচার বিভাগের ওপর প্রকাশ্য আঘাত হানে (গণেশন ২০২৫; কুমারস্বামী ২০০৬)।লিফারের মতে, ‘মাহাথির মালয়েশিয়ার রাজনীতিকে নিজের ইচ্ছার অধীন করেছিলেন এবং এ প্রক্রিয়ায় সাংবিধানিক রাজতন্ত্র, বিচার বিভাগ ও প্রধান রাজনৈতিক দল ইউনাইটেড মালয়স ন্যাশনাল অর্গানাইজেশনকে সফলভাবে অধীনস্থ করেছিলেন। ১৯৮৭ সালের বড় চ্যালেঞ্জ অল্প ব্যবধানে মোকাবিলা করেও তিনি দলটির নেতৃত্ব অবিচ্ছিন্নভাবে ধরে রাখেন’ (লিফার ১৯৯৯)। তিনি আরও লিখেছেন, মাহাথির ‘কেবল কর্তৃত্ববাদীই নন, অত্যন্ত লড়াকু ও সংঘাতপ্রবণ এবং প্রকাশ্য কটূক্তিতে দক্ষ’। সময়ের সঙ্গে তাঁর শাসন আরও ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে। তবে এই ব্যক্তিকেন্দ্রীকরণ কেবল তাঁর ব্যক্তিত্বনির্ভর ছিল না; প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর পরিবর্তনও ‘স্বৈরাচারী ক্ষমতার কার্যকর কেন্দ্রীভবনকে সহায়তা করেছিল’ (স্লেটার ২০০৩)। এসব কারণে গবেষকেরা মালয়েশিয়াকে ‘আধা গণতন্ত্র’, ‘দমনমূলক প্রতিক্রিয়াশীল শাসনব্যবস্থা’ এবং ‘নরম কর্তৃত্ববাদ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন (জাকারিয়া ১৯৮৯; কেস ১৯৯৩; মিন্স ১৯৯৬)।২০০৩ সালে মাহাথিরের পদত্যাগের পরও বারিসান ন্যাশনাল ক্ষমতায় থাকে। ২০০৯ সালে নাজিব রাজাক প্রধানমন্ত্রী হন এবং প্রায় ১০ বছর (২০০৯–২০১৮) দেশ শাসন করেন। তাঁর শাসনও ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘন ও দুর্নীতিতে চিহ্নিত ছিল। বিশ্লেষকদের মতে, নাজিব তাঁর পূর্বসূরির স্বৈরতান্ত্রিক শাসন পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করেছিলেন (উফেন ২০২২)। ২০১৮ সালের নির্বাচনে স্বাধীনতার পর প্রথমবার বিরোধীরা বারিসান ন্যাশনালকে ক্ষমতাচ্যুত করে; পাকাতান হারাপান (পিএইচ) জোট অপ্রত্যাশিত বিজয় অর্জন করে।এই পটভূমিতে ২০১৯ সালে প্রধানমন্ত্রীর জন্য দুই মেয়াদের সীমা নির্ধারণের দীর্ঘদিনের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পাকাতান হারাপান (পিএইচ) জোট সংবিধান সংশোধনের বিল উত্থাপন করে। দুই প্রধানমন্ত্রীর দীর্ঘ ক্ষমতায় থাকা এবং তৃতীয় একজনের কর্তৃত্ববাদের দিকে অগ্রসর হওয়ার অভিজ্ঞতার প্রতিক্রিয়ায় এ উদ্যোগ নেওয়া হয়। স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল, প্রধানমন্ত্রীর পদে টানা মেয়াদ একজন নেতার কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠার পথ তৈরি করেছে।লক্ষণীয় যে বিলটি উত্থাপনকারী সরকারের নেতৃত্বে ছিলেন মাহাথির মোহাম্মদ নিজেই; দীর্ঘ বিরতির পর তিনি বিরোধী জোটের নেতা হিসেবে ক্ষমতায় ফিরেছিলেন (ওয়েস্টারম্যান ও সুলিভান ২০১৮)। তবে তান শ্রী মহিউদ্দিন ইয়াসিনের প্রশাসনে ২০২০ সালের আগস্টে মন্ত্রিসভার সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে বিলটি প্রত্যাহার করা হয়। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে প্রস্তাবটি আবার সামনে আসে। প্রধানমন্ত্রী দাতুক সেরি ইসমাইল সাবরি ইয়াকুব তাঁর সরকারের প্রতি বিরোধীদের সমর্থনের বিনিময়ে ১০ বছরের মেয়াদসীমা প্রবর্তনে সম্মত হন। ২০২২ সালের শুরুতে গণমাধ্যম জানায়, সংসদে উত্থাপনের জন্য একটি খসড়া বিল প্রস্তুত; কিন্তু ওই বছরের অক্টোবরে পঞ্চদশ সাধারণ নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দেওয়ায় তা আর উত্থাপিত হয়নি।২০২৫ সালে প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ দুই দফা বা ১০ বছরে সীমিত করার প্রস্তাব সমর্থন করেন (কৃষ্ণান ২০২৫)। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে মন্ত্রিসভা প্রস্তাবটি অনুমোদন করে (দ্য স্ট্রেইট টাইমস ২০২৬); কিন্তু সংসদের নিম্নকক্ষে প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে এটি ব্যর্থ হয় (রয়টার্স ২০২৬)।ভারত: মেয়াদসীমা নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ দাবিদার?ভারতে ২০২৪ সালে নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তৃতীয় মেয়াদ শুরু করলে এক বিশ্লেষক বলেন, প্রধানমন্ত্রীর তৃতীয় মেয়াদে লাগাম টানার সময় অনেক আগেই এসেছে (শেফার্ড ২০২৪)। দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকা ভারতের জন্য নতুন নয়। প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ১৭ বছর দায়িত্ব পালনের পর ১৯৬৪ সালে তৃতীয় মেয়াদে মৃত্যুবরণ করেন। ইন্দিরা গান্ধী ১৯৬৬ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত টানা তিন মেয়াদ এবং ১৯৮০ থেকে পাঞ্জাবে সামরিক অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৮৪ সালে নিহত হওয়া পর্যন্ত আরেক মেয়াদ দায়িত্ব পালন করেন।নেহরুকে ভারতীয় গণতন্ত্রের অভিভাবক হিসেবে বর্ণনা করা হলেও বিশ্লেষকদের মতে, ভারতে সাম্প্রতিক কর্তৃত্ববাদী প্রবণতার শিকড় নেহরু যুগে প্রোথিত হয়েছিল এবং ইন্দিরা গান্ধীর শাসনামলে তা আরও বিকশিত হয়।ত্রিপুরাদমন সিংয়ের ভাষায়:‘নেহরুর শাসনামলে—“শাসন” শব্দটি আমি সচেতনভাবেই ব্যবহার করছি—হায়দরাবাদ, কাশ্মীর, মণিপুর ও নাগাল্যান্ডে আঞ্চলিক সার্বভৌমত্ব নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘাত হয়েছে; ১৯৪৮ সালে হায়দরাবাদে ভারতের ইতিহাসের ভয়াবহতম মুসলিমবিরোধী সহিংসতার একটিতে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছেন; প্রথম সংশোধনীর মাধ্যমে সাংবিধানিকভাবে নাগরিক স্বাধীনতা খর্ব করা হয়েছে এবং সশস্ত্র বাহিনী (বিশেষ ক্ষমতা) আইনের মতো কঠোর আইন প্রণীত হয়েছে’ (সিং ২০২৩)।নেহরু ব্যাপকভাবে প্রশংসিত এবং আধুনিক ভারতের স্থপতি হিসেবে পরিচিত হলেও, কেউ কেউ তাঁর শাসনশৈলীকে স্বৈরতান্ত্রিক বলে বর্ণনা করেছেন (শর্মা ২০১২)। তাঁর শাসনের তিনটি বৈশিষ্ট্যে কর্তৃত্ববাদের ছাপ স্পষ্ট: ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং দল ও নেতৃত্বের ওপর অতিনির্ভরতা (ভার্মা ২০২৫)। চারির মতে:‘নেহরু শক্তিশালী কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান ও ক্ষমতাধর প্রশাসনিক ব্যবস্থার ধারণাকে উৎসাহিত করেছিলেন। কিন্তু ব্রিটিশ বা মার্কিন গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের বিপরীতে তিনি প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিত করতে চাননি এবং ১৭ বছর পদে ছিলেন। প্রথম সাধারণ নির্বাচনের আগেই তাঁর মন্ত্রিসভা থেকে প্রায় সাতজন মন্ত্রী পদত্যাগ করেন। ১৯৫০ সালের পর মহাত্মা গান্ধী ও সরদার প্যাটেল কেউই জীবিত না থাকায় নেহরুর স্বৈরতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে লাগাম টানার মতো আর কেউ ছিলেন না। তাঁর গণতান্ত্রিক কার্যধারার পরিহাস এখানেই: তিনি যোগ্য সহকর্মীদের মন্ত্রিসভা ছেড়ে যেতে দিয়েছেন, কিন্তু কখনো নিজের ব্যর্থতা স্বীকার করেননি’ (চারি ২০১৮)।ভারতের ইতিহাসে প্রধানমন্ত্রীর প্রকাশ্য ক্ষমতার অপব্যবহারের সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ ইন্দিরা গান্ধীর দ্বিতীয় (১৯৬৭–১৯৭১) ও তৃতীয় (১৯৭১–১৯৭৭) মেয়াদ। প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী দায়িত্বে থাকা অবস্থায় মারা গেলে ১৯৬৬ সালে তিনি ক্ষমতায় আসেন। ক্ষমতাসীন ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের (আইএনসি) নেতৃত্বে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাজিত করেন। ১৯৬৬ সালে তিনি প্রধানমন্ত্রী হলে লাইফ সাময়িকীতে মারভিন জিম লেখেন, ‘কংগ্রেস নেতারা নেহরুর ১৭ বছরের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনে কার্যত দমবন্ধ অবস্থায় ছিলেন; মিসেস গান্ধীকে প্রধানমন্ত্রী বেছে নেওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল এই আশা যে তিনি যথেষ্ট সংযত থাকবেন এবং তাঁদের নিজস্ব ক্ষমতার পরিসরে হস্তক্ষেপ করবেন না’ (জিম ১৯৬৬)।এক বছরের মধ্যেই নির্বাচনে তিনি নিজের পক্ষে জনসমর্থন নিশ্চিত করেন এবং ক্ষমতায় তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু হয়। ১৯৬৯ সালে তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হলে কংগ্রেস বিভক্ত হয় (হার্ডগ্রেভ ১৯৭০)। তাঁর নেতৃত্বাধীন অংশটি ছোট আঞ্চলিক দলগুলোর সমর্থনে ক্ষমতায় থাকে। দলের অভ্যন্তরীণ লড়াইয়ে ইন্দিরা গান্ধীর কৌশল ক্ষমতা দখলের প্রতি তাঁর প্রবণতার আগাম ইঙ্গিত দিয়েছিল। দলভাঙন ও কংগ্রেসের রূপান্তর ব্যাখ্যা করে মহেন্দ্র সিং বলেন, ‘দলীয় ব্যবস্থার ওপর মিসেস গান্ধীর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রভাব সম্ভবত ছিল আগের প্রাতিষ্ঠানিক, কিন্তু ক্রমে ক্ষয়িষ্ণু কংগ্রেসের জায়গায় অত্যন্ত ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও কেন্দ্রীভূত এক কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করা, যা প্রায় চেনার বাইরে বদলে গিয়েছিল’ (সিং ১৯৮১)।১৯৭০ সাল থেকে রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখে ইন্দিরা গান্ধী শাসনসংক্রান্ত সিদ্ধান্তে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা ব্যবহার করতে শুরু করেন। ফলে মানবাধিকারের চরম অবজ্ঞা দেখা দেয় এবং রাজ্য সরকারগুলোর ক্ষমতা খর্ব করতে সাংবিধানিক বিধান ব্যবহৃত হয়। ৩৫৬ অনুচ্ছেদের অধীনে ঘন ঘন রাষ্ট্রপতির শাসন জারি তার একটি উদাহরণ। ১৯৬৬ থেকে ১৯৭৭ সালের মধ্যে তিনি ৩৫ বার এবং ১৯৮০–১৯৮৪ সালের চতুর্থ মেয়াদে ১৫ বার এই বিধান ব্যবহার করেন।ইন্দিরা গান্ধীর শাসনের নির্ধারক ঘটনা ছিল ১৯৭৫ সালের ২৪ জুন ৩৫২ অনুচ্ছেদ প্রয়োগ করে জরুরি অবস্থা ঘোষণা। সরকারের নীতির বিরুদ্ধে বিরোধীদের প্রতিবাদে সৃষ্ট রাজনৈতিক অস্থিরতা ছিল তাৎক্ষণিক পটভূমি; তবে জরুরি অবস্থা জারির সিদ্ধান্তে তাঁর নিয়ন্ত্রণহীন ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষাই বেশি কার্যকর ছিল।মোড় ঘোরানো ঘটনা ছিল ১৯৭৫ সালের ১২ জুন এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায়, যেখানে ইন্দিরা গান্ধীকে নির্বাচনী অনিয়মে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। আদালত রায়বেরেলি আসনে তাঁর নির্বাচন বাতিল করে এবং ছয় বছরের জন্য নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিষিদ্ধ করে। ১২ দিন পর প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর অনুরোধে রাষ্ট্রপতি ফখরুদ্দিন আলী আহমেদ জরুরি অবস্থা জারি করেন। এতে কেন্দ্রীয় সরকার ব্যাপক ক্ষমতা পায়, নাগরিক স্বাধীনতা স্থগিত ও সংবাদপত্রে সেন্সরশিপ আরোপ করে। হাজারো মানুষ গ্রেপ্তার হন এবং সংবাদপত্র বন্ধ হয়। বাক্‌স্বাধীনতা, সমাবেশের স্বাধীনতা ও ব্যক্তিস্বাধীনতাসহ সংবিধানপ্রদত্ত মৌলিক অধিকার সংকুচিত হয়। ২১ মাস পর জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার করা হলেও এটি ভারতীয় ইতিহাসের অন্ধকারতম অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত। একজন বিশ্লেষক ইন্দিরা গান্ধীর তিন মেয়াদের সংক্ষিপ্ত মূল্যায়ন দিয়েছেন:‘ইন্দিরা গান্ধীর শাসনামলে ভারতীয় বিমানবাহিনী নিজ দেশের নাগরিকদের ওপর বোমাবর্ষণ করেছে; মিজোরামের গ্রামবাসীদের ব্যাপকভাবে জোরপূর্বক স্থানান্তর করা হয়েছে; জরুরি অবস্থা (১৯৭৫–১৯৭৭), ব্যাপক সংবিধানবিরোধী কর্মকাণ্ড, জোরপূর্বক বন্ধ্যাকরণ, পাঞ্জাবে রক্তপাত, আসামের নেলি অঞ্চলে মুসলিমদের গণহত্যা এবং ১৯৭০-এর দশকের গোড়ায় পশ্চিমবঙ্গে “অপারেশন স্টিপলচেজ” ও নির্মম কমিউনিস্টবিরোধী সহিংসতা ২০২২ সংঘটিত হয়েছে।’ (সিং ২০২৩)১৯৭৭ সালের নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধী পরাজিত হলেও ১৯৭৮ সালের উপনির্বাচনে জয়ী হন এবং ১৯৮০ সালে ক্ষমতায় ফেরেন। তাঁর চতুর্থ মেয়াদ আগেরগুলোর চেয়ে বেশি প্রাণঘাতী ছিল। ১৯৮৪ সালের জুনে শিখ যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে ‘অপারেশন ব্লু স্টার’-এ শিখ ধর্মাবলম্বীদের পবিত্রতম স্থানে শত শত তীর্থযাত্রী নিহত হন। একই সময়ে পাঞ্জাবের আরও ৪১টি মন্দিরে সামরিক অভিযান চালানো হয়। জওহরলাল নেহরু ও ইন্দিরা গান্ধীর দীর্ঘ শাসন দেখায়, নিয়ন্ত্রণহীন ক্ষমতা ও সময়সীমার অনুপস্থিতি তাঁদের কর্তৃত্ববাদী আচরণে সহায়তা করেছে এবং গণতন্ত্রকে দুর্বল করেছে।অন্যান্য উদাহরণঅন্যান্য দেশের মধ্যে ইসরায়েলে ২০১৬, ২০২১ ও ২০২২ সালে বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক হয়েছে (বেনদাহ ২০১৬; চায়না ডেইলি ২০২২; ওয়াইনেট নিউজ ২০২২)। আফ্রিকায় ইথিওপিয়া ২০১৮ সালে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা বিবেচনা করে (নিউজ.সিএন ২০১৮)। ক্যারিবীয় অঞ্চলে ত্রিনিদাদ ও টোবাগোতে ২০২৪ সালে (ডেইলি এক্সপ্রেস ২০২৪) এবং জ্যামাইকায় ২০১৭ সালে এ নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয় (দ্য গ্লিনার ২০১৭)। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত ও নেপালেও প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কয়েক দশক ধরে জটিল গণতান্ত্রিক উত্তরণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়া নেপাল ২০২২ সালে বিষয়টি বিবেচনা করে (ঘিমিরে ২০২২)।প্রধানমন্ত্রীদের মেয়াদসীমা কেন প্রয়োজন?ওয়েস্টমিনস্টার ধাঁচের সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর নির্দিষ্ট মেয়াদ থাকে না। তাঁর পদে বহাল থাকা নির্ভর করে সংসদের মেয়াদ, সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থা এবং তাঁকে নেতৃত্বে রাখার বিষয়ে ক্ষমতাসীন দলের সিদ্ধান্তের ওপর। রাষ্ট্রপতি বা রাজা/ রানি যখন মনে করেন যে কোনো ব্যক্তি সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন পান, তখন তাঁকে সরকার গঠনের আহ্বান জানানো হয়। সংসদের আস্থা হারালে বা ক্ষমতাসীন দল নেতৃত্ব পরিবর্তন করলে প্রধানমন্ত্রীকে সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় অপসারণ করা সম্ভব। এ কারণে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আপত্তি রয়েছে; উদাহরণস্বরূপ, ভেনিস কমিশন একে ন্যায়সংগত মনে করে না (ভেনিস কমিশন ২০১৯, ৭৩)। আদর্শ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর একতরফা ক্ষমতা থাকার কথা নয়; মন্ত্রিসভার সঙ্গে পরামর্শ করে তাঁর কাজ করার কথা। তবু ‘এমন প্রমাণ রয়েছে যে অন্তত কিছু সংসদীয় ব্যবস্থা রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যপূর্ণ, অধিক ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্বের দিকে এগোচ্ছে’ (মেজি ২০২০, ১০)। পোগুন্টকে ও ওয়েব এই প্রবণতাকে সংসদীয় ব্যবস্থার ‘রাষ্ট্রপতিকরণ’ বলেছেন (পোগুন্টকে ও ওয়েব ২০০৫)।এই প্রবণতা প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা নির্ধারণের পক্ষে যুক্তিকে আরও জোরালো করেছে। ক্রমে বেশি মানুষ বলছেন, নির্বাহী প্রধানের মেয়াদসীমার আদর্শিক ভিত্তি—গণতান্ত্রিক অখণ্ডতা, আইনের শাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি রক্ষা—সংসদীয় ব্যবস্থার প্রধানমন্ত্রীর ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক। কারণ, সময়ের সঙ্গে তাঁরা প্রভাব ও ক্ষমতা সুসংহত করে রাষ্ট্রপতিসুলভ ক্ষমতা অর্জন করতে পারেন। রাষ্ট্রপতির মেয়াদসীমার অন্তর্নিহিত যুক্তি—ক্ষমতার একচেটিয়াকরণ প্রতিরোধ ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা—প্রধানমন্ত্রী প্রধান নির্বাহী হিসেবে কাজ করেন, এমন ব্যবস্থাতেও সমানভাবে প্রযোজ্য।এই আদর্শিক যুক্তিকে সংসদীয় ব্যবস্থার একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য আরও শক্তিশালী করে: প্রধানমন্ত্রী আইনসভা ও নির্বাহী—উভয় শাখার ওপরই প্রভাবশালী কর্তৃত্ব রাখেন। কিছু ক্ষেত্রে নির্বাহী ক্ষমতা রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ভাগ হলেও, সংসদের মাধ্যমে আইন প্রণয়ন এবং সেই নীতি বাস্তবায়নে নির্বাহী বিভাগকে নির্দেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর অন্তর্নিহিত ক্ষমতা তাতে নাকচ হয় না। সীমাহীন ও নিয়ন্ত্রণহীন নির্বাহী কর্তৃত্ব প্রাতিষ্ঠানিক অখণ্ডতা ক্ষুণ্ন করতে এবং শাসনপ্রক্রিয়াকে বিকৃত করতে পারে।দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রীরা প্রায়ই ক্ষমতাসীন থাকার সুবিধা—আইনসভায় আধিপত্য, দলীয়কৃত আমলাতন্ত্র এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদে অসম প্রবেশাধিকার—ব্যবহার করে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন, রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের অপব্যবহার করেন (বাঙ্কুতি ও অন্যান্য ২০২৩)। ওয়েস্টমিনস্টার ধাঁচের গণতন্ত্রে সংসদের কাছে যৌথভাবে দায়বদ্ধ মন্ত্রিসভায় প্রধানমন্ত্রী ‘সমানদের মধ্যে প্রথম’ (Primus inter pares) হিসেবে কাজ করবেন বলে প্রত্যাশা করা হলেও, প্রায়ই তিনি সীমিত প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণসহ একক নির্বাহী কর্তৃত্বে পরিণত হন।মেয়াদের সময়সীমা ছাড়া দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার গুরুতর পরিণতির মধ্যে রয়েছে অপ্রাতিষ্ঠানিকীকরণ (deinstitutionalization) এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতার সুসংহতকরণ। অপ্রাতিষ্ঠানিকীকরণ বলতে রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও রীতিনীতির দুর্বল হয়ে পড়া বা ক্ষয়কে বোঝায়। এটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসনের নির্ধারক বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে, যেখানে ক্ষমতা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বণ্টিত না থেকে একজন নেতার হাতে কেন্দ্রীভূত হয়। এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র ও ব্যক্তির মধ্যকার পার্থক্য অস্পষ্ট হয়ে যায় এবং ব্যক্তির প্রতি আনুগত্যই নিয়মে পরিণত হয়; এর ফল হিসেবে ‘ব্যক্তিপূজা’ (cult of personality) এবং ক্ষমতাসীনের দেবতাকরণ দেখা দেয়।ওপরের চারটি কেস স্টাডিতে এই প্রবণতাগুলো স্পষ্ট। ইন্দিরা গান্ধী, মাহাথির মোহাম্মদ, শেখ হাসিনা ও ভিক্টর অরবান নির্বাহী ক্ষমতার অতিবৃদ্ধিতে যুক্ত ছিলেন; অর্থাৎ তাঁরা ‘আইনসভা ও বিচারব্যবস্থার ক্ষমতার ভারসাম্য ও পারস্পরিক নিয়ন্ত্রণ অতিক্রম করে ক্ষমতা সম্প্রসারণ করেছেন অথবা বেসামরিক প্রশাসনের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করেছেন’ (উইলিয়ামসন ২০২৩)। আইনসভা নির্বাহী বিভাগের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারেনি বা করেনি; বরং নির্বাহী বিভাগের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।ভারতে ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থার সময় আইনসভা বারবার জরুরি অবস্থার মেয়াদ বাড়ায় এবং ‘মেইনটেন্যান্স অব ইন্টারনাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট’সহ সরকারকে জরুরি নীতি বাস্তবায়নের সুযোগ দেওয়া বিভিন্ন আইন পাস করে। মাহাথির মোহাম্মদের অধীনে মালয়েশিয়ায় ক্ষমতার ব্যক্তিকেন্দ্রীকরণ আইনসভাসহ সব প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে। লেইয়ের ভাষায়, ‘সম্ভবত মাহাথির যুগের সবচেয়ে স্থায়ী পরিণতি ছিল বিচার বিভাগ, রাজপরিবার, স্বাধীন বেসামরিক প্রশাসন, সংসদ ও নির্বাচনী ব্যবস্থাসহ মালয়েশিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলোকে সচেতন ও সিদ্ধান্তমূলকভাবে দুর্বল করা’ (লেই ২০০১; স্লেটার ২০২৩)। ২০১০ থেকে ২০২৬ সালের অরবান আমলে হাঙ্গেরির পুরো রাষ্ট্রকাঠামো পুনর্গঠিত হয়। ‘অরবান ও ফিদেসের প্রাতিষ্ঠানিক ও অর্থনৈতিক দখলের গভীরতা কর্তৃত্ববাদী সুসংহতকরণ এবং যাকে চরম সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদ বলা যায়, তার প্রধান উদাহরণ’ (ফ্রিডম্যান ও রুই ২০২৬)।মেয়াদসীমাহীন প্রধানমন্ত্রী অনুগত আইনসভা পেলে সাংবিধানিক সংশোধনের মাধ্যমে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের অধীন করতে পারেন। ভারতে ইন্দিরা গান্ধীর অধীনে ১৯৭৬ সালের ৪২তম সংশোধনী (আন্ধিয়ারুজিনা ২০১৮), মালয়েশিয়ায় মাহাথিরের অধীনে ১৯৮৮ সালের সংশোধনী—বিশেষত ১২১(১) অনুচ্ছেদ—এবং বাংলাদেশে হাসিনার অধীনে ২০১৪ সালের ষোড়শ সংশোধনী এর স্পষ্ট উদাহরণ। এসব সংশোধনী বিচারপতি নিয়োগ ও অপসারণে নির্বাহী হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি করে।হাসিনার ক্ষেত্রে ২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে অনির্দিষ্টকাল ক্ষমতায় থাকার পথ আরও সুগম হয়। সংশোধনীটি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান বাতিল করে এবং ব্যাপক নির্বাচনী কারসাজির বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রক্ষাকবচ সরিয়ে দেয় (রীয়াজ ২০১৬)। অরবান ২০১১ সালে নতুন সংবিধান প্রণয়নের আগে পুরোনো সংবিধানে ১২টি সংশোধনী এনেছিলেন; নতুন সংবিধান নির্বাহী বিভাগ, বিশেষত প্রধানমন্ত্রীকে লাগামহীন ক্ষমতা দেয়।প্রধানমন্ত্রীদের দীর্ঘ মেয়াদ গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত করে সমালোচকদের নীরব করার উপকরণ তাঁদের হাতে দেয়। ১৯৯৯ ও ২০০০ সালে কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) মাহাথিরকে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার অন্যতম নিকৃষ্ট শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে (সিপিজে ২০০০)। চতুর্থ মেয়াদে ২০২১ সালে রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স হাসিনাকে ‘সংবাদপত্রের স্বাধীনতার শিকারি’ হিসেবে চিহ্নিত করে। আরএসএফ সূচকে তাঁর শাসনে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা দ্রুত অবনতি ঘটে: ২০১১ সালের ৫৭ পয়েন্ট থেকে ২০২৪ সালে ২৭.৬৪ পয়েন্টে নেমে যায় (ঢাকা ট্রিবিউন ২০২৪)। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮-এর মতো কঠোর আইন শাসনের পছন্দের হাতিয়ার হয়ে ওঠে (রীয়াজ ২০২১)। ইন্দিরার জরুরি অবস্থায় সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাই প্রথম ক্ষতিগ্রস্ত হয়—‘সংবাদপত্রে সেন্সরশিপ, সাংবাদিক গ্রেপ্তার এবং সংবাদ সংস্থাগুলো একীভূত করার মাধ্যমে ইন্দিরা গান্ধীর সরকার জরুরি অবস্থার ২১ মাস জনপরিসরের আলোচনা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছিল’ (পিটিআই ২০২৫)। অরবানের অধীনেও আইন ও আইনবহির্ভূত ব্যবস্থায় গণমাধ্যমকে রাষ্ট্র ও দলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনা হয় (রুল অব ল, এনওয়াইইউ ল ২০২৬)। এর মধ্যে ছিল মিডিয়া ও যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণকারী আইন সংশোধন—অ্যাক্ট সিআইভি (২০১০)—ও ২০২৩ সালের ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্ট, ন্যাশনাল মিডিয়া অ্যান্ড ইনফোকমিউনিকেশনস অথরিটি প্রতিষ্ঠা এবং পাবলিক সার্ভিস ফাউন্ডেশন গঠন।উপসংহারবিশ্বজুড়ে ব্যাপকভাবে প্রচলিত রাষ্ট্রপতির মেয়াদসীমার পক্ষে যুক্তিগুলোর আলোকে এই প্রবন্ধে পরীক্ষা করা হয়েছে, সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর ওপরও মেয়াদসীমা আরোপ করা উচিত কি না। এখানে দেখানো হয়েছে যে গণতান্ত্রিক নীতির জন্য ক্ষতিকর নির্বাহী ক্ষমতার অতিবৃদ্ধির সম্ভাবনা ঠেকাতে রাষ্ট্রপতির মেয়াদসীমা প্রায় সর্বজনীন হয়ে উঠেছে। এর উদ্দেশ্য হলো নেতাকে এমন পদক্ষেপ থেকে বিরত রাখা, যা ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করে প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে। গণতন্ত্র সচল রাখতে প্রতিষ্ঠান ও সেগুলোর কার্যকারিতা অপরিহার্য। ব্যক্তিগত ক্ষমতার অতিবৃদ্ধি আইনসভা, বিচার বিভাগ ও নির্বাচনের মতো প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে বাধা দেওয়ার পাশাপাশি এগুলোকে ভেতর থেকে ফাঁপা করে দেয়। ক্ষমতার ব্যক্তিকেন্দ্রীকরণ এমন পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে নেতার বন্দনা স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয় এবং গণমাধ্যমের প্রহরীর ভূমিকা পালনের সক্ষমতা বিলুপ্ত হয়।হাঙ্গেরি, ভারত, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার কেস স্টাডিগুলো প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমার পক্ষে জোরালো যুক্তি তুলে ধরে। এসব উদাহরণ দেখায়, মেয়াদসীমার অনুপস্থিতিতে ভারতের জওহরলাল নেহরু ও ইন্দিরা গান্ধী, মালয়েশিয়ার মাহাথির মোহাম্মদ, বাংলাদেশের শেখ হাসিনা ও হাঙ্গেরির ভিক্টর অরবান ক্ষমতাসীন পদের সুবিধা ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করেছেন এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসন সুসংহত করেছেন। নির্বাহী ক্ষমতার অতিবৃদ্ধির অংশ হিসেবে তাঁরা সংবিধান সংশোধন করেছেন এবং জবাবদিহিমূলক শাসনকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন। প্রান্তটীকা১। প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা থাকা দ্বিতীয় দেশ লাও পিপলস ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক (লাওস)। তবে আলোচনায় লাওসকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। কারণ, এটি একদলীয় রাষ্ট্র এবং মেয়াদসীমা কেবল প্রধানমন্ত্রীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। দেশটির রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তারা টানা সর্বোচ্চ দুটি ৫ বছর মেয়াদে—মোট ১০ বছর দায়িত্ব পালন করতে পারেন।২। ১১টি কমিশন ছিল—সংবিধান সংস্কার কমিশন, নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন, বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন, পুলিশ সংস্কার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার কমিশন, জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন, নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন, গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন, স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন, শ্রম সংস্কার কমিশন এবং স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন।৩। ১৮৪৪ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে ক্যারিবীয় অঞ্চলের ডোমিনিকান রিপাবলিক রেকর্ড ৩২টি সংবিধান প্রণয়ন করেছে। ২০টি বা তার বেশি সংবিধান থাকা অন্য তিনটি দেশ হলো ভেনেজুয়েলা (২৬টি), হাইতি (২৪টি) ও ইকুয়েডর (২০টি) (দ্য নেশন ২০২২)।৪। প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল, প্রধানমন্ত্রী ও সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া অন্য সব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে হতো (অনুচ্ছেদ ৪৮(৩)। অনুচ্ছেদ ৫৫ অনুযায়ী, সরকারের সব নির্বাহী কার্যক্রম রাষ্ট্রপতির নামে পরিচালিত হবে, যদিও নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রী বা তাঁর কর্তৃত্বে প্রয়োগ করা হবে; রাষ্ট্রপতির পদক্ষেপ নিয়েও আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে না। ফলে রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে নির্বাহী বিভাগের ওপর প্রধানমন্ত্রীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং তা বিচারিক তদারকির বাইরে থাকে।৫। এর একটি কারণ ছিল শেখ মুজিবুর রহমানের (মুজিব) প্রভাব। পাকিস্তান আমলে (১৯৪৭–১৯৭১) জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে তিনি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেন এবং নবগঠিত রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা ব্যক্তিত্ব হিসেবে আবির্ভূত হন। সংবিধান প্রণয়নের সময় গণপরিষদের সদস্যরা তাঁর স্থলাভিষিক্ত অন্য কারও সম্ভাবনা বিবেচনা করেননি বলেই প্রতীয়মান হয়।৬। গত ৫৩ বছরে ৭০ অনুচ্ছেদ কয়েকবার সংশোধিত হলেও সংসদ সদস্যদের নিজ দলের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া থেকে বিরত রাখার মূল বিধান অপরিবর্তিত রয়েছে (৭০ অনুচ্ছেদের বিবর্তন সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে দেখুন: আহমেদ ২০১০)। ১৯৭২ সালের সংবিধানে দলত্যাগের দুটি শর্ত ছিল: ১. কোনো সংসদ সদস্য দল থেকে পদত্যাগ করলে; অথবা ২. সংসদে নিজ দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে।৭। নতুন বিধানে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রচলিত শর্তটি—অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির প্রতি সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন থাকতে হবে—অন্তর্ভুক্ত ছিল না। বরং এতে বলা হয়, সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতাসম্পন্ন যে কাউকে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ করতে পারবেন।৮। ‘সংসদে নিজ দলের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া’ কথাটির ব্যাখ্যা হিসেবে প্রচলিত শর্তগুলোর সঙ্গে আরও দুটি শর্ত যুক্ত করা হয়: ১. কোনো সদস্য সংসদে উপস্থিত থেকেও ভোটদানে বিরত থাকলে; অথবা ২. নিজ দলের নির্দেশ অমান্য করে সংসদের কোনো বৈঠকে অনুপস্থিত থাকলে (আহমেদ ২০১০)।৯। সে সময় দেশের বাইরে থাকায় মুজিবের দুই কন্যা—শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বেঁচে যান।১০। পঞ্চম সংশোধনীর অধীনে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব ছিল রাষ্ট্রপতিকে ‘পরামর্শ দেওয়া’ (অনুচ্ছেদ ৫৮ক)। সপ্তম সংশোধনের পরও এই বিধান বহাল ছিল।১১। প্রথম সংশোধনী সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে দেখুন: সিনহা ও কুমার (২০২৪)।১২। ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বে দল ও বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিসরে সংঘটিত পরিবর্তনের বিশদ বিশ্লেষণের জন্য দেখুন: কবিরাজ (১৯৮৬) ও আলম (১৯৮২)।১৩। রাষ্ট্রপতির শাসন হলো এমন একটি অবস্থা, যখন রাজ্য সরকার স্থগিত করা হয় এবং কেন্দ্রীয় সরকার নিজের নিয়োগ করা রাজ্যপালের মাধ্যমে সরাসরি ওই রাজ্য পরিচালনা করে।১৪। সে সময় ৩৫২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধে রাষ্ট্রপতি যুদ্ধ, অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা বা অন্যান্য কারণে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে পারতেন।১৫। জরুরি অবস্থার পটভূমি এবং এর স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে ১৯৭৭ সাল থেকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে। উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে জাফরেলো ও অনিল (২০২০), প্রকাশ (২০১৮), নায়ার (২০১৩) এবং ধর (২০০০)।.রচনাপঞ্জি আলম ১৯৮২।। J. Alam, ‘Congress Party: Consensus Politics to Autocratic Regime’, Economic and Political Weekly, 17(28/29), July 10-17: 1142-1145।আলমগীর ও আব্বাস ২০২৫।। M. Alamgir and Md. Abbas, ‘Parties agree to cap PM’s term at 10yrs’, The Daily Star, 28 July, https://www.thedailystar.net/news/bangladesh/politics/news/parties-agree-cap-pms-term-10yrs-3949041, প্রবেশ: ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৫।আন্ধিয়ারুজিনা ২০১৮।। T. R. Andhyarujina, ‘A Committed Judiciary: Indira Gandhi and Judicial Appointments’, in A. Sengupta and R. Sharma (eds.), Appointment of Judges to the Supreme Court of India:

Source: https://www.protichinta.com/article/qgfddr4303